Skip to content
Home » অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ PDF | সারমর্ম সংক্ষেপ | প্রশ্ন উত্তর নোট

অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ PDF | সারমর্ম সংক্ষেপ | প্রশ্ন উত্তর নোট

অসমাপ্ত আত্মজীবনী PDF রিভিউ Oshomapto Attojiboni

বইয়ের নামঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী
লেখকঃ শেখ মুজিবুর রহমান
বইয়ের ধরনঃ আত্মকথা
পৃষ্ঠাঃ ৩২৯
মূল্যঃ ২২০ টাকা
প্রথম প্রকাশঃ জুন, ২০১২
প্রচ্ছদঃ সমর মজুমদার
প্রকাশনাঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
ব্যক্তিগত রেটিংঃ ৪.৯/৫
রিভিউ করেছেনঃ Fahad Hossain Fahim

অসমাপ্ত আত্মজীবনী ~ বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের বিরচন ও তাঁর জনকগাথা।

“একদিন মরতে হবেই, অন্যায় ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে যদি মরতে পারি, সে মরাতেও শান্তি আছে”

ভোরের পাখি জাগে একাকী, ঠিক সূর্যোদয়ের আগে, গান গায় মনের আনন্দে, সূর্য ওঠার পর সে মুখ লুকোয় রাঙা মেঘেদের ডানায়। শেখ মুজিবুর রহমানও ছিলেন ঠিক তেমনি। তবে অন্যসব পাখিরা স্বার্থের নধরদেহী জীমূতে যখন বিলীন, শেখ মুজিব তখন দেশপ্রেমের আগুনে খাক হওয়া ফিনিক্স পাখি। কারণ একজন বাঙালি হিসেবে যা কিছু বাঙালিদের সাথে সম্পৃক্ত তা-ই তাকে ভাবিয়েছে গভীরভাবে। বাংলার জনসাধারণের দুর্দশায় তাঁর গভীর ও নিখাদ উদ্বেগ, অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান, ন্যায়ের পক্ষে অকুতোভয় সাহস তাঁকে আন্দোলন গড়ে তুলতে শক্তি জুগিয়েছে। তাঁর প্রেরণাদায়ী নেতৃত্ব, কঠোর সংকল্প, গতিশীলতা ও অভাবনীয় স্বতঃপ্রবৃত্ত শক্তি কোটি কোটি নর নারী এমনকি শিশু অনুসারী সৃষ্টিতে সক্ষম হয়েছে। তাইতো ১৯৬৯ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি এদেশের জনগণ গভীর ভালোবাসায় তাঁকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করে। আর জেলে বসেও একজন মানুষ কতোটা ভালোবাসতে পারে তাঁর দেশ ও জাতিকে, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ না পড়লে কখনোই তা জানতে পারতাম না।

বন্ধুবান্ধব, সহকর্মী এবং সহধর্মিণীর অনুরোধে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রাজবন্দি থাকাকালে শেখ মুজিব লিখতে শুরু করেন তাঁর আত্মজীবনী। ১৯৬৬ – ৬৯ দীর্ঘ চার বছর ধরে তিনি লিখেছেন অলঙ্কারশোভিত ঘনঘটাময় মহাকাব্যের অমর বিরচন। তবে শেষ করে যেতে পারেনি তাঁর নৈর্ব্যক্তিক কাব্যগাথা। ১৩২৬ বঙ্গাব্দে চৈত্র মাসের ৩ তারিখে পিতা শেখ লুৎফর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুনের ক্রোড় আলোকিত করে ধরণীতে এসেছিলেন শেখ মুজিব। কৈশোর থেকেই ছিলেন টিমোথি পেনপোয়েমের মতো বিদ্রোহী আর গনতন্ত্রের মানসপুত্রের মতো অকুতোভয়। তাইতো হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর হাতেই তাঁর রাজনীতির হাতেখড়ি। বংশপরিচয়, জন্ম, শিক্ষা ও রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বলতে বলতে তিনি থেমে গেছেন ১৯৫৫ তে। শেষ লাইনটি লিখেছেনঃ ‘তাতেই আমাদের হয়ে গেলো।’ কিন্তু আমাদের যে হয় না তাতে! আমরা আরও শুনতে চাই তাঁর সুখপ্রদ কাব্য। কারণ এ কাব্য যে একান্ত আমাদের, আমাদের রক্তে মিশে আছে বঙ্গবন্ধুর ইতিহাস, আমাদের পতাকার লালে লীন হয়ে আছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র গল্প।

কাশফুলের শুভ্রতার মোহমুগ্ধ বাঁকে, মধুমতীর তীরে শেখ বোরহানউদ্দিন নামক এক ধার্মিক পুরুষ গোড়াপত্তন করেছিলেন শেখ পরিবারের। শেখ মুজিব স্থানীয় জমিদার ও নীলকরদের সঙ্গে তাঁর পূর্বপুরুষের প্রতিরোধ সংগ্রামের গল্প শুনে বড়ো হন। তাঁর বংশধর শেখ কুদরতউল্লাহ যখন ভুঁইফোঁড় ইংরেজ রাইনের বিরুদ্ধে ‘আধা পয়সা’ জরিমানা করে বলেছিলেন, ” টাকা আমি গুনি না, মেপে রাখি। টাকার আমার দরকার নাই। তুমি আমার লোকের উপর অত্যাচার করেছ; আমি প্রতিশোধ নিলাম “, তখন আমি বিস্ময়ে আবিষ্ট হয়ে ভেবেছি তাঁর আত্মগৌরবের কথা। শেখ মুজিবও তাঁদের যোগ্য উত্তরাধিকারী, যিনি কখনোই আপোস করেননি অন্যায়ের বিরুদ্ধে। নানা শেখ আবদুল মজিদ ও দাদা শেখ আবদুল হামিদ ছিলেন একই বংশের লোক। ছোট দাদা খান সাহেব আবদুর রশিদ কতৃক প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি এম ই স্কুলেই তাঁর লেখাপড়ার হাতেখড়ি। চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হোন গোপালগঞ্জ পাবলিক স্কুলে। ১৯৩৪ এ সপ্তম শ্রেণির ছাত্রাবস্থায় বেরিবেরি এবং ১৯৩৬ এ গ্লুকোমাতে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পর ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে শুরু হয় তাঁর পড়াশোনা। ১৯৩৮ সালে তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা ফজলুল হক ও শ্রমমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দীর সংসর্গ বদলে দেয় তাঁর রাজনৈতিক মনন। ১৮ বছর বয়স থেকেই শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক জীবন। রমাপদকে হত্যা চেষ্টার মিথ্যা মামলার জন্য এ বয়সেই প্রথম জেল খাটতে হয়েছিল তাকে।

আরও পড়ুনঃ আমার দেখা নয়াচীন রিভিউ পিডিএফ | শেখ মুজিবুর রহমান PDF

ডানপিটে শেখ মুজিব পড়াশোনার পাশাপাশি খেলাধুলায়ও ছিলেন দূরন্ত। পেশায় মুন্সেফ আদালতের সেরেস্তাদার হলেও বাবা ছিলেন অফিসার্স ক্লাবের সেক্রেটারি, আর যেখানে গিয়েছেন মুজিব সেখানেই ছিলেন নেতা, শেষমেশ নেতৃত্ব দিয়েছেন একটা দেশ ও জাতির আত্মপরিচয় সৃষ্টিতেও। ১৯৪১ সালে ম্যাট্রিক পরীক্ষার পর ভর্তি হোন কলকাতা ইসলামিয়া কলেজে। শুরু হয় সক্রিয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ। ১৯৪৩ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে যুবক মুজিবের আত্মত্যাগে আমি অভিভূত হয়েছি। দেশ ও জাতির হিতে কাজ করতে গিয়ে কতটাই না কষ্ট করতে হয়েছে তাকে, একের পর এক নেমে এসেছে বিপদ। লিয়াকত আলী খান বলেছিলেন, “যো আওয়ামী লীগ কারেগা, উসকা শের হাম কুচাল দেংগা।” কিন্তু পিতার দেয়া ‘sincerity of purpose and honesty of purpose’ এর শিক্ষা তাঁকে পরাজিত হতে দেয়নি। তাঁর পিতার অভয় বাণীতে মুজিব পেয়েছিলেন নতুন পথের দিশা; আমৃত্যু কাজ করেছেন দেশের জন্য। ১৯৪৪ সালে শহীদ সাহেব যখন তাঁকে বললেন, “Who are you? You are nobody.” ছয় দফার হ্যামীলনের বংশীবাদক টগবগে মুজিবও তখন বলেছিলেন, ” If I am nobody, then why you have invited me? You have no right to insult me. I will prove that I am somebody.” সত্যি সত্যিই তিনি প্রমাণ করেছিলেন সে কথা। প্রকৃতার্থে তিনি শুধু ‘somebody’ ই, তিনি হচ্ছেন বাঙালি জাতির ‘everything’. অবশ্য সোহরাওয়ার্দী যে আদর করে তাঁকে বলেছিলেন সেকথা, তা তিনি মনে রেখেছেন আজীবন। তাইতো ছিলেন তিনি বিরলপ্রজ দেশপ্রেমিক, আত্মত্যাগী, আদর্শবাদী ও প্রত্যুৎপন্নমতি রাজনৈতিক নেতা, আপোষহীন জননায়ক, জিতেন্দ্রীয় বাঙালি শেরপা ও বাঙালি জাতির পিতা।

শেখ মুজিবুর রহমান সাধুতা, নীতি, কর্মশক্তি ও দক্ষতা দিয়ে জয় করেছিলেন মানুষের মন। তিনি পর্যবেক্ষণ করেছেন সোহরাওয়ার্দীর উদার রাজনীতি। সেজন্য বারবার অপমানিত ও পরাজয়বরণ করতে হয়েছে শহীদ সাহেবকে৷ তাইতো শেখ মুজিব আমাদের উপদেশ দিয়ে বলেছেন, ” উদারতা দরকার, কিন্তু নীচ অন্তঃকরণের ব্যক্তিদের সাথে উদারতা দেখালে ভবিষ্যতে ভালর থেকে মন্দই বেশি হয়, দেশের ও জনগণের ক্ষতি হয়৷” তিনি দেখিয়েছেন যে, অন্ধ কুসংস্কার, অলৌকিক বিশ্বাস ও পরশ্রীকাতরতা হচ্ছে বাঙালির দুঃখের মূল কারণ। দৈনিক আজাদ কাগজের ভক্ত ছিলেন, প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন নিজেদের ‘মিল্লাত’ কাগজও। ছিলেন ভ্রমণ পিপাসু, তাঁর অতীন্দ্ৰিয় পর্যবেক্ষণ আমাদের মুগ্ধ ও বিহ্বল হতে বাধ্য করে। হিন্দু মুসলমান দাঙ্গা প্রতিরোধে তাঁর সাহসিকতা ছিল চোখে পড়ার মতো। মৃত্যুর ভয় না করে কিভাবে তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন মানুষের কল্যাণে, তা শুধু তাঁর পক্ষেই করা সম্ভব ছিল। তাঁর অপ্রতিম ব্যক্তিত্ব, অসাধারণ রাজনৈতিক জ্ঞান, বিচক্ষণতা ও কর্মদক্ষতা তাই আমাদের জন্য আদর্শ।

স্বাধীন ও জনকল্যাণমুখী পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পেছনে নিজেদের সর্বস্ব বিলিয়ে দিলেন যারা, পাকিস্তান সৃষ্টির পর তাদের অবস্থা এই – ” এত তাড়াতাড়ি এরা আমাদের ভুলে গেল হক সাহেব। হক সাহেব হেসে দিয়ে বললেন, এই তো দুনিয়া!” শেখ মুজিব যখনই নায্য কথা বলেছেন, জনগণের অধিকারের কথা বলেছেন স্বার্থপর শাসক গোষ্ঠী তখনই জেলে আটকে রেখেছে তাকে। কিন্তু ফিনিক্স পাখিকে কি আটকে রাখা যায়? ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ৪ঠা জানুয়ারি শিক্ষা, শান্তি, প্রগতি স্লোগানকে ধারণ করে শেখ মুজিব গড়ে তুলেন ‘পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ’। অফিস করলেন ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে। এদিকে পাকিস্তান সরকার তাঁর উপর শুরু করে দিয়েছে গোয়েন্দা নজরদারি। তবুও থেমে থাকেননি শেখ মুজিব। ১৯৪৮ সালে গঠিত ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ এর সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৯৪৮ সালের ১১ই মার্চ রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে হরতাল পালনের সময় তিনি গ্রেফতার ও কারারুদ্ধ হন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারীতে তিনি কারাগারে নিরাপত্তা আইনে বন্দী অবস্থায় ‘বাংলা রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদে’র মোহাম্মদ তোয়াহা ও অলি আহাদের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, ২১ ফেব্রুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’ বলে পালন করা হবে, আর, তিনি জেল থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবীতে অনশন করেন এবং ২১ শে ফেব্রুয়ারী মিছিলে গুলি চালানোর প্রতিবাদ করেন। রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করার মাধ্যমে সংগ্রাম করেছেন বাংলা ভাষার জন্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার আদায়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কারসহ জেলও খাটতে হয়েছিল তাকে। তবুও আপোস করেননি মুজিব। তিনি ছিলেন সত্যিই মুজিব – অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাড়াদানকারী। তিনি প্রতিবাদ করেছেন কর্ডন প্রথার বিরুদ্ধে, ফলে জেল খেটেছেন ১৯৪৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বরে। তিনি প্রতিবাদ করেছেন অপরাজনীতির বিরুদ্ধে, পালন করেছেন জুলুম প্রতিরোধ দিবস। তারই ধারাবাহিকতায় তাকে যুগ্ম সচিব করে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন গড়ে উঠে গনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’। শুরু হয় তাঁর রাজনৈতিক সন্দীপন, শুরু হয় কঠোরতম জেল জুলুম। তবুও থামে না শেখ মুজিব। জেলে বসেই অনশন করেছেন মাতৃভাষার জন্য। নিজের দেশ ও জাতিকে সত্যিকারভাবে ভালো না বাসলে, কেউ কি এতোটা ত্যাগ স্বীকার করতে পারে! তিনি লিখেছেন, ” একদিন সকালে আমি ও রেণু বিছানায় বসে গল্প করছিলাম। হাচু ও কামাল নিচে খেলছিল। হাচু মাঝে মাঝে খেলা ফেলে আমার কাছে আসে আর ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ বলে ডাকে। কামাল চেয়ে থাকে। এক সময় কামাল হাচিনাকে বলছে, ‘হাচু আপা, হাচু আপা, তোমার আব্বাকে আমি একটু আব্বা বলি।’ আমি আর রেণু দুজনই শুনলাম। আস্তে আস্তে বিছানা থেকে উঠে যেয়ে ওকে কোলে নিয়ে বললাম, ‘আমি তো তোমারও আব্বা।’ এমনিতে কামাল আমার কাছে আসতে চাইত না। আজ গলা ধরে পড়ে রইল। বুঝতে পারলাম, এখন আর ও সহ্য করতে পারছে না। নিজের ছেলেও অনেক দিন না দেখলে ভুলে যায়! আমি যখন জেলে যাই তখন ওর বয়স মাত্র কয়েক মাস। রাজনৈতিক কারণে একজনকে বিনা বিচারে বন্দি করে রাখা আর তার আত্মীয়স্বজন ছেলেমেয়েদের কাছ থেকে দূরে রাখা যে কত বড় জঘন্য কাজ তা কে বুঝবে? “

আরও পড়ুনঃ কারাগারের রোজনামচা সারমর্ম | বই রিভিউ | শেখ মুজিবুর রহমান PDF

শেখ মুজিবের জীবনী লেখার পটভূমি, বংশ পরিচয়, শৈশব, কৈশোর থেকে শুরু করে সামাজিক, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, দুর্ভিক্ষ, বিহার ও কলকাতার দাঙ্গা, দেশভাগ, কলকাতা কেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি, কেন্দ্রীয় ও মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজীর দাঙ্গা, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ এবং সেসব বিষয়ে তাঁর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার সুচারু বর্ণনা রয়েছে বইটিতে। বহুমাত্রিক এই বইটিতে আছে তাঁর কারাজীবন, পিতা মাতা, সন্তান সন্ততি, সর্বংসহা সহধর্মিণীর কথা, আছে তাঁর চীন, ভারত ও পশ্চিম পাকিস্তান ভ্রমণের কথাও।

শেখ মুজিবের মহাপ্রয়াণের উনত্রিশ বছর পর ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা থেকে বেঁচে ফিরে তাঁর আদরের হাচু তাঁর লিখিত চারটি খাতা পেয়ে যেমন বেদনার মাঝেও খুঁজে পেয়েছিল আলোর দিশা, তেমনিভাবে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রতিটি বাঙালির জন্যও প্রদীপতুল্য। অসমাপ্ত আত্মজীবনী-ই আমাদের আত্মপরিচয়ের বুকের বাঁশরি। বইটি পড়তে গিয়ে বারবার আমার চপল মন তাই বলে উঠে, ” অন্তর হতে আহরি বচন, আনন্দলোক করি বিরচন। ” বার্ট্রান্ড রাসেল বলেছেন, ” একটি বই পড়ার দুটি উদ্দেশ্য থাকা উচিত; একটি হল- বইটিকে উপভোগ করা; অন্যটি হল- বইটি নিয়ে গর্ব করতে পারা।” অসমাপ্ত আত্মজীবনীর সংসর্গে এসে আমার দুটো উদ্দেশ্যই হয়েছে সফল। ‘বইয়ের পাতায় প্রদীপ জ্বলে/ বইয়ের পাতা স্বপ্ন বলে’, সত্যিই ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইটি পাঠ না করলে হুমায়ুন আজাদের কথাটি হয়তো অনুভব করতে সমর্থই হতাম না। এটি এমন একটি গ্রন্থ যার দিঘল পাতা জুড়ে দুর্দম্য সূর্য ওঠে, যার পাতায় পাতায় নধরকান্তি সুরভিত গোলাপ ফোটে। বইয়ের পাতাও যে দীপ্তিময় পাঞ্জেরী হয়ে পাঠককে স্বপ্ন দেখাতে জানে, সুখপাঠ্য এ বইটিই তার প্রমাণ।

‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ মূলত বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সংগ্রামের পথপ্রদর্শক। চিত্তহারী অথচ ক্ষুরধার, অপ্রত্যাশিত অথচ অনিবার্য, সরল অথচ বলিষ্ঠ শব্দচিত্রের আড়ালে শেখ মুজিব এঁকেছেন বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের ছবি। তাঁর দেশপ্রেম, উদারচিন্তা, নিষ্ঠা, মুক্তবুদ্ধি, সৎ সাহস, আত্মানুসন্ধান ও সাহিত্য লিরিকের মূর্ছনার মাধ্যমে প্রগতিশীল ও সার্বভৌম বাঙালি চেতনার আনুপুরবিক ভাস্বরতার যে পথ তিনি আমাদেরকে দেখিয়ে গেছেন, ভাব সত্যের বিদুৎ বিকাশে আজও তা সংকর্ষিত ও অনুরণিত করে আমাদেরকে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ তাই বাঙালির সংগ্রাম, পরিচয় ও মনীষার অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রকাশ। বইটি বাঙালি জাতির আত্মপরিচয়ের বিরচন, বইটি তাঁর জাতির পিতার বিবরণ। বইটি আমাদের আত্ম বিকাশের রাজনৈতিক দলিল। তাই নিজেদের যারা বাংলাদেশি কিংবা মানুষ বলেও পরিচয় দিতে চান, তাদের জন্য বইটি অবশ্যপাঠ্য। ইংরেজ কবি শেক্সপিয়ার বলেছিলেন, ” এ জগতে কেউ কেউ জন্মগতভাবে মহান, কেউ মহত্বের লক্ষণ নিয়ে জন্মগ্রহণ করেন, আবার কেউ স্বীয় প্রচেষ্টায় মহানুভবতা অর্জন করেন৷ ” আমার মতে, এই ৩টি বৈশিষ্ট্যই শেখ মুজিবের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য৷ তাঁর ভাবনা ছিল আকাশচুম্বী আর অনুপ্রেরণার কেন্দ্রবিন্দু ছিল জনগণ। কালের পরম্পরায় মুসলিম লীগ ঘরানার রাজনীতি থেকে বেরিয়ে সমমনা বয়োজ্যেষ্ঠ, বয়োকনিষ্ঠদের সার্বিক সহায়তায় প্রধান সংগঠক হিসেবে ১৯৪৮ ও ১৯৪৯ সালে প্রতিষ্ঠা করেন প্রগতিশীল সংগঠনের। আজও তার সুবাতাস বইছে চারদিকে। ৫৫ বছরের ক্ষুদ্র জীবনে ৪ হাজার ৬৮২ দিন কাটিয়েছেন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে। এর মধ্যেই এতো আলো জ্বালিয়েছেন, এত সাড়া জাগিয়েছেন, এত কিছু অর্জন করেছেন – কল্পনাকেও হার মানায়। নিজেকে উজাড় করে পৃথিবীকে অবাক করে দিয়েছেন। চারিদিকে জয়ের প্রতিধ্বনি। আঁধার দূরীভূত হয়ে কবির ভাষায় ‘এত আলো’। বাংলাদেশের পাখিরা যদি গান গাইতে পারত, তাহলে হয়তো মিষ্টি স্বরে গেয়ে উঠতঃ ‘এত আলো জ্বালিয়েছ এই গগনে/ কী উৎসবের লগনে।’ প্রত্যাশিত বেদনার বিষয় পাখিদের কণ্ঠে ধ্বনি আছে, শিস আছে, সুরেলা শব্দ আছে, ওদের নিজস্ব গানও আছে। নেই কেবল প্রান্তিক মানুষের বন্ধু, বাংলা ও বাঙালিকে জাগানো সারথি, নেই দুঃখী মানুষের কণ্ঠস্বর, শেখ মুজিব। তবুও সোনার বাংলায় যখনই দেখা দেয় আঁধার, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র স্বর্গীয় দীপ্তি এসে নির্বাপিত করে দেয় অন্ধকারের পাহাড়।

আরও পড়ুনঃ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে বইগুলো একবার হলেও পড়া উচিত | সেরা ৫০০ বইয়ের তালিকা

প্রিয় উক্তিঃ

১) আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হল ‘আমরা মুসলমান, আর একটা হল, আমরা বাঙালি।’ পরশ্রীকাতরতা এবং বিশ্বাসঘাতকতা আমাদের রক্তের মধ্যে রয়েছে। বোধহয় দুনিয়ার কোন ভাষায়ই এই কথাটা পাওয়া যাবে না, ‘পরশ্রীকাতরতা’। পরের শ্রী দেখে যে কাতর হয়, তাকে ‘পরশ্রীকাতর’ বলে।

২) যে ছেলেমেয়েরা তাদের বাবা-মায়ের স্নেহ থেকে বঞ্চিত, তাদের মতো হতভাগা দুনিয়াতে আর কেউ নাই। আর যারা বাবা মায়ের স্নেহ আর আশীর্বাদ পায় তাদের মতো সৌভাগ্যবান কয়জন!

৩) অযোগ্য নেতৃত্ব, নীতিহীন নেতা, ও কাপুরুষ রাজনীতিবিদদের সাথে কোনদিন একসাথে হয়ে দেশের কোন কাজ করতে নেই। তাতে দেশসেবার চেয়ে দেশের ও জনগণের সর্বনাশই বেশি হয়।

৪) আমি চিন্তাভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয়, সংশোধন করে নেই। কারণ, যারা কাজ করে তাদেরই ভুল হতে পারে, যারা কাজ করেনা তাদের ভুল ও হয়না।

৫) যে কোনো জাতি তার মাতৃভাষাকে ভালবাসে। মাতৃভাষার অপমান কোনো জাতিই কোনো কালে সহ্য করে নাই।

৬) মানুষকে ব্যবহার, ভালবাসা ও প্রীতি দিয়েই জয় করা যায়, অত্যাচার, জুলুম ও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না।

৭) মানুষকে ভালবাসলে মানুষও ভালবাসে। যদি সামান্য ত্যাগ স্বীকার করেন, তবে জনসাধারণ আপনার জন্য জীবন দিতেও পারে।

আরও পড়ুনঃ সংস্কৃত নবরঙ্গ থেকে ইংরেজি Orange | কমলা | বাংলা ভাষার বিবর্তন


বইয়ের নামঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী
লেখকের নামঃ শেখ মুজিবুর রহমান
বইয়ের ধরণঃ আত্মজীবনীগ্রন্থ
প্রচ্ছদঃ সমর মজুমদার
প্রকাশকঃ দি ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড
প্রথম প্রকাশঃ ১৮ জুন, ২০১২
পৃষ্ঠা সংখ্যাঃ ৩২৯
মুদ্রিত মূল্যঃ ২২০ টাকা
রিভিউ করেছেনঃ Mâhíñür Rãshîd

অসমাপ্ত আত্মজীবনীঃ বাঙালি জাতির এক মহান নেতার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিজীবনের এক অনবদ্য স্মৃতিগাঁথা।

সহকর্মীদের এবং সহধর্মিণীর পীড়াপীড়িতে ১৯৬৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে থাকা অবস্থায় বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনী লেখা শুরু করেছিলেন। জীবনীটিতে বঙ্গবন্ধুর জন্ম, বংশ পরিচয়, পূর্বপুরুষদের সময়কালীন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং বংশের আর্থিক অবস্থা, বাল্যকাল, শিক্ষা জীবনের রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মকান্ড এবং ব্যক্তিজীবনের বর্ণনার পাশাপাশি দুর্ভিক্ষ, কলকাতা-নোয়াখালী-ঢাকা-বিহারে পর্যায়ক্রমিক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, ভারত-পাকিস্তান ভাগ, কলকাতাকেন্দ্রিক প্রাদেশিক মুসলিম ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগের রাজনীতি-অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠনের ইতিহাস, আদমজী জুটমিলে বাঙালি-অবাঙালি শ্রমিকদের দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও ষড়যন্ত্রের ইতিহাসের বর্ণনাও পাওয়া যায়।

সেক্ষেত্রে বইটিকে শুধুমাত্র একটি আত্মজীবনী না বলে বাঙালি জাতির মুক্তি-সংগ্রাম সূচনার ইতিহাসের এক অখন্ড দলিল বললেও ভুল হবে না!

বঙ্গবন্ধু তাঁর আত্মজীবনীটি লেখা শুরু করেছিলেন নিজের জন্মস্থান, বংশ ও বাল্যকাল বর্ণনার মাধ্যমে। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চে মধুমতী নদী সংলগ্ন ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়া গ্রামের শেখ বংশে, যার গোড়াপত্তন করেছিলেন শেখ বোরহানউদ্দিন নামের এক ধার্মিক পুরুষ। বঙ্গবন্ধুর বাবার নাম শেখ লুৎফর রহমান, মায়ের নাম সায়েরা খাতুন। শুরুতে অনেক আভিজাত্যপূর্ণ এবং সম্পদশালী বংশ হিসেবে শেখ বংশের নাম-ডাক থাকলেও ইংরেজ, রাণী রাসমণী এবং কাজী বংশের সাথে পরপর কয়েকটি দাঙ্গা-লড়াইয়ের কারণে শেখ বংশের শুধু আভিজাত্যটাই থাকলো, অর্থ-সম্পদ কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না। অবশ্য শেখদের দুর্দিন আসলেও তারা কখনোই ইংরেজদের গ্রহণ করতে পারেনি এবং কখনো ইংরেজিও পড়ে নি। ফলে তারা আরো অনেক পেছনে পরে গেল। এভাবেই ধীরে ধীরে শেখ বংশের সব হারিয়েছে, কিন্তু আজও তারা পুরাতন স্মৃতি ও পুরাতন ইতিহাস স্মরণ করে গর্ব করে থাকেন।

আরও পড়ুনঃ সিদ্ধান্তহীনতা দূর করার উপায় কি? আমরা কেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি?

বংশের বড় ছেলে হওয়াতে বাড়ির আদর-আহ্লাদ সব তারই পাওনা ছিল। ছোটবেলাতেই বেরিবেরি এবং গ্লুকোমা নামক ভয়াবহ রোগে আক্রান্ত হওয়ার পরেও দুষ্টুমির কোনো কমতি ছিল না বঙ্গবন্ধুর। ফুটবল, ভলিবল, হকি খেলায় স্কুল টিমে ভাল অবস্থান ছিল তাঁর। এছাড়াও ভীষণ একগুঁয়ে ছিলেন তিনি। তাঁর নিজের একটা দল ছিল। মারপিট করতেন প্রচুর। দলের ছেলেদের কেউ কিছু বললে রক্ষা ছিল না, একসাথে ঝাঁপিয়ে পড়তেন। তবে ছোটবেলা থেকেই আনন্দবাজার, বসুমতী, আজাদ, মাসিক মোহাম্মদী, সওগাত- এসব পত্রিকাও প্রতিদিন পড়তেন বঙ্গবন্ধু।

বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকান্ডের হাতে খড়ি হয়েছিল ১৯৩৬ সালে, স্কুলজীবনেই প্রতিদিন বিকেলে তৎকালীন স্বদেশী আন্দোলনের সভায় যাওয়ার মধ্য দিয়ে। বঙ্গবন্ধুর গৃহশিক্ষক কাজী আবদুল হামিদ এমএসসি মাস্টার সাহেব ১৯৩৭ সালে গোপালগঞ্জে একটা “মুসলিম সেবা সমিতি” গঠন করেছিলেন, যার উদ্দেশ্য ছিল সকল মুসলমান বাড়ি থেকে মুষ্ঠি ভিক্ষার মাধ্যমে চাল উঠিয়ে সে চাল বিক্রি করে গরিব ছেলেদের বই-পরীক্ষার ও অন্যান্য খরচের যোগান দেওয়া। এসমস্ত কাজে বঙ্গবন্ধুই মাস্টার সাহেবকে বেশিরভাগ কাজে সহায়তা করতো। এছাড়াও হঠাৎ যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে মাস্টার সাহেবের মৃত্যুবরণের পর বঙ্গবন্ধুই এই সেবা সমিতির ভার নিয়েছিলেন এবং অনেকদিন পর্যন্ত পরিচালনা করেন। আর এভাবেই সামাজিক কার্যকলাপের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু।

১৯৩৮ সালে এগজিবিশন উদ্ভোদনের জন্য এবং এক বিরাট সভায় উপস্থিত হতে গোপালগঞ্জে এসেছিলেন তৎকালীন বাংলার প্রধানমন্ত্রী শেরে বাংলা এ. কে. ফজলুল হক এবং শ্রমমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। সেই সভা এবং এগজিবিশনে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু। সেদিন মিশন স্কুল পরিদর্শনের সময় সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে প্রথম কথা হয় বঙ্গবন্ধুর। এরপর থেকে প্রায় মাঝে মধ্যেই তাদের মধ্যে চিঠি আদান-প্রদান হতো। আর এই সোহরাওয়ার্দী সাহেবের বর্ণনাই পাওয়া যায় এই পুরু বই জুড়ে। সম্পূর্ণ বইজুড়ে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং বঙ্গবন্ধুর মধ্যকার শ্রদ্ধা-স্নেহের সম্পর্ক এতটা বিশেষভাবেই অঙ্কিত আছে যে, বইটির কিছু কিছু অংশে হয়তো এটা মনে হতে বাধ্য যে আত্মজীবনী বইটির নায়ক যেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-ই।

বঙ্গবন্ধুর জীবনে প্রথম জেল হয়েছিল ১৯৩৮ সালের মার্চ/এপ্রিল মাসে, হিন্দু-মুসলমানদের এক দাঙ্গার কারণে। সেই দিন বঙ্গবন্ধুসহ আরো সাত/আটজনের নামে মামলা হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নামে এজাহার দিয়েছিল মিথ্যে “এটেম্পট টু মারডার” কেস এ। সে যাত্রায় সাতদিন জেল হাজতে থাকার পর জামিন পেয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। বঙ্গবন্ধু কখনোই অন্যায়ের সাথে আপোশ করতেন না। জনগণের উপর করা জুলুম-নির্যাতনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন সদা প্রতিবাদী। কোনোদিনও ক্ষমতার লোভ করেননি তিনি, শুধুমাত্র দেশ ও জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করে যেতে চেয়েছিলেন। অথচ রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশের পর তাঁর এই ন্যায়-সোচ্চার, দৃঢ়, প্রতিবাদী চরিত্রের জন্য অসংখ্যবার বিনা বিচারে নিরাপত্তা আইনের অধীনে জেল খাটতে হয়েছিলো মাসের পর মাস।

আরও পড়ুনঃ নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থের রুপাই চরিত্রের বাস্তব পরিচয় ও জীবনী

রাজনীতিতে বঙ্গবন্ধুর আনুষ্ঠানিকভাবে প্রবেশ ঘটেছিলো ১৯৩৯ সালে গোপালগঞ্জে মুসলিম ছাত্রলীগ গঠন করার মাধ্যমে। তৎকালীন মুসলিম লীগের সদস্য খন্দকার শামসুদ্দীন সাহেব এমএলএ হয়েছিলেন ছাত্রলীগের সভাপতি এবং বঙ্গবন্ধু হলেন সাধারণ সম্পাদক। পাশাপাশি গোপালগঞ্জে তখনই গঠন করা হয় মুসলিন লীগ এবং মুসলিম লীগের ডিফেন্স কমিটি, যার সেক্রেটারি হলেন বঙ্গবন্ধু। তবে ১৯৪১ সাল থেকে বঙ্গবন্ধু মন-প্রাণ দিয়ে রাজনীতি শুরু করে। মাদারীপুরে গিয়েও গঠন করেন মুসলিম ছাত্রলীগ, যদিও মুসলিম লীগ বলতে গোপালগঞ্জে তাকেই বুঝাতো। এছাড়া ১৯৪২ সালে বঙ্গবন্ধুর হাত ধরেই কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ হয়ে উঠেছিলো বাংলাদেশের ছাত্র আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র। পরবর্তীতে ১৯৪৩ সালে প্রাদেশিক মুসলিম লীগ কাউন্সিলের সদস্য হওয়ার মাধ্যমেই সক্রিয়ভাবে রাজনীতি শুরু করেন বঙ্গবন্ধু।

জনগণ ছিল বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনের তপস্যার আঁধার। কোনোদিনই তিনি জনগণের কষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। ১৯৪৩ সালের দুর্ভিক্ষে ইংরেজদের যুদ্ধের জন্য কিভাবে যে বাংলার মানুষকে না খেয়ে রাস্তায় রাস্তায় মরে পড়ে থাকতে দেখা গিয়েছিলো এবং সেই বিভীষিকাময় দিনগুলোতে সোহরাওয়ার্দী সাহেবের সাথে বঙ্গবন্ধু আর তার কয়েকজন সহকর্মী কিভাবে নিঃস্বার্থভাবে দুর্ভিক্ষপীড়িতদের সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন- তারও বর্ণনা পাওয়া যায় এই আত্মজীবনীতে।

এছাড়াও বঙ্গবন্ধু যে হোস্টেলে থাকতেন, সেখানকার ছাত্রদের বিপদে-আপদে সবসময় পাশে থাকতেন তিনি। কোন ছাত্রের কি অসুবিধা হচ্ছে, কোন ছাত্র হোস্টেলে জায়গা পায় না, কার ফ্রি সিট লাগবে এসব ব্যাপারে প্রিন্সিপালের কাছে তিনিই গিয়ে হাজির হতেন। এমনকি সিট না পাওয়া ছাত্রদের জন্য তাঁর রুমই ছিল ছাত্রদের ফ্রি সিট। এভাবেই অসহায়, গরীব ছাত্রদের পাশে সবসময় তিনি থাকতেন বলে ছাত্ররাও তাকে খুব ভালবাসতো।

জীবনীগ্রন্থটিতে বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে যোগদানের পেছনে তাঁর পরিবারের অবদান কতটা অসামান্য ছিল তারও উল্লেখ রয়েছে। অনেক কম বয়স থেকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাজনীতিতে যুক্ত থাকার কারণে কেউ বঙ্গবন্ধুর নামে হুমকিস্বরূপ অভিযোগ তুললে তাঁর পিতা উলটো ছেলের পক্ষ নিতেন। কারণ তিনি জানতেন তার ছেলে দেশের জন্য কাজ করছে। এর জন্য যখন বঙ্গবন্ধুকে জেলও খাটতে হয় কোনো আফসোস করেননি তিনি। বাড়িতে থাকাকালীন নিয়মিত ছেলের সাথে তিনি রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা করতেন আর বঙ্গবন্ধুকে উৎসাহ দেয়ার জন্য বলতেন, “Sincerity of purpose and honesty of purpose থাকলে জীবনে পরাজিত হবে না”, যা সারাজীবন বঙ্গবন্ধুকে বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পাড় হওয়ার অন্যতম পাথেয় হিসেবে কাজ করেছিলো।

বঙ্গবন্ধুর সফল রাজনৈতিক জীবনের পেছনে তাঁর স্ত্রী বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা ত্যাগ-তীতিক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল তারও বর্ণনা ছিল এই বইয়ে। নিজের বাবা-মা, স্ত্রী, সন্তানদের ভীষণ ভালবাসতেন বঙ্গবন্ধু। কিন্তু নিজের দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য সে সুখও ত্যাগ করেছিলেন তিনি। পরিবার-পরিজনদের ফেলে মাসের পর মাস জেলে দিন গুজরান করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি। প্রতিবার মুক্তির পর আরো দ্বিগুণ উৎসাহে কাজ করে গিয়েছেন দেশের জন্য।

আরও পড়ুনঃ হাট্টিমাটিম টিম ছড়াটির লেখক কে? সম্পূর্ণ কবিতার আসল রচয়িতা কে?

সেই সময় বঙ্গবন্ধুর সম্পূর্ণ ধ্যান-জ্ঞান ছিল স্বাধীন ও সার্বভৌম পাকিস্তান গঠন করা। তবে শত আন্দোলনের পর পাকিস্তান হওয়ার সাথে সাথেই খান বাহাদুর ও ব্রিটিশ খেতাবধারীরা ক্ষমতা দখলের জন্য কিভাবে তৎপর হয়ে উঠেছিল তাও তুলে ধরেছিলেন বঙ্গবন্ধু।

নিজের ব্যক্তিজীবন, রাজনৈতিক জীবনের বাইরেও ভ্রমণকাহিনীর একাংশও খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর এই জীবনীগ্রন্থে। ১৯৪৬ সালের ৭,৮,৯ এপ্রিল দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ভারতবর্ষের মুসলিম লীগপন্থী কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের কনভেনশন শেষে আজমীর শরীফে খাজাবাবুর দরগাহ, তারাগড় পাহাড়, আনার সাগর, মোগল শিল্প ও স্থাপত্যকলার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন এবং বাদশা শাজাহানের অমর প্রেমের নিদর্শন আগ্রার তাজমহল, ইতিমাদ-উদ-দৌলা, আগ্রা দূর্গের দেওয়ানি আম, মতি মসজিদ, মছি ভবন, নাগিনা মসজিদ, দেওয়ানি খাস ও জেসমিন টাওয়ার, ফতেহপুর সিক্রি ও সেকেন্দা, সেলিম চিশতীর দরগাহ, তানসেনের বাড়ি ইত্যাদি ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণের কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি স্থানগুলোর মোহণীয় সৌন্দর্য এত নিখুঁতভাবে বর্ণনা করা দেখলে খুব সহজেই বোঝা যায় বঙ্গবন্ধু কতটা ভ্রমণপ্রিয় স্বভাবের ছিলেন! এছাড়াও বঙ্গবন্ধু কতটা কবিতা ও সংগীতপ্রেমী ছিলেন তাঁর আত্মজীবনী পড়লে তাও বোঝা যায়।

জীবনীগ্রন্থটি পড়ে দেখা যায় বঙ্গবন্ধু শুধুমাত্র ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের স্মৃতিচারণা করেছেন, অর্থাৎ যা ছিল অসমাপ্ত। সেদিক থেকে “অসমাপ্ত আত্মজীবনী” বইটির নামের স্বার্থকতা বিচার করলে যথাযথই ধরা যায়। তবে আত্মজীবনীটির শেষ অংশে ১৯৫৫ থেকে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবন বৃত্তান্ত সংযুক্ত করা হয়েছে, যেখান থেকে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের অনেক খুঁটিনাটি তথ্য জানা যায়।

আরও পড়ুনঃ জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম-সনদ অথবা সার্টিফিকেটে নামের ভুল সংশোধন

বঙ্গবন্ধু তার জেলজীবন কাটানোর সময় নিজের জীবনের কাহিনীগুলো একসাথে জুড়ে কলমের আঁচে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন যথেষ্ট পরিপক্কতার সাথে। ঘটনা, স্থান, সময়ের উল্লেখ দেখে যে কেউ হলপ করে বলে দিতে পারবে কতটা প্রখর স্মৃতিশক্তি সম্পন্ন ছিলেন তিনি। কিন্তু তবুও বইটি পড়ে মাঝেমধ্যে মনে হয়েছিল, একের পর এক ঘটনা বর্ণনার ঘোরে লেখক এতটাই নিমজ্জিত ছিলেন যে পড়তে পড়তে মাঝে মধ্যে ঘটনার সামঞ্জস্যতা মেলাতে কিছুটা হলেও কষ্টসাধ্য হয়ে উঠেছিল।

এই ছোট্ট অসাঞ্জস্যতা ছাড়া বঙ্গবন্ধুর হাস্যোজ্জ্বল বাল্যকাল, ভালবাসায় তাড়িত সাংসারিক জীবনের বর্ণনা, তৎকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার কোন্দল-অপরাজনীতির কাহিনী পড়তে পড়তে যে কারো মনে হতে পারে এটি যেন একটি বহুমাত্রিক জেনরের আত্মজীবনী! এতটা যত্ননিয়ে সুনিপুণভাবে লিখিত বই যেকোনো পাঠকের কাছে পরম সুখপাঠ্য হয়ে উঠতে বাধ্য। এছাড়াও ১৯২০ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যকার তৎকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থার ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতম ব্যাপারগুলো জানার জন্য হলেও বইটি প্রত্যেক বাঙালির পড়া অবশ্যকর্তব্য।

আরও পড়ুনঃ শেখ মুজিব আমার পিতা PDF বই রিভিউ গ্রন্থ সমালোচনা | শেখ হাসিনা

Tags:
x
error: Content is protected !!