Skip to content
Home » সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী | ৬ষ্ঠ পর্ব | সম্পূর্ণ জীবন কাহিনী | Sukanta

সুকান্ত ভট্টাচার্যের জীবনী | ৬ষ্ঠ পর্ব | সম্পূর্ণ জীবন কাহিনী | Sukanta

সুকান্ত ভট্টাচার্য জীবনী ৬ষ্ঠ পর্ব গল্প কবিতা রচনা সমগ্র pdf

পৌষ, ৪৮ তাঁর বন্ধু অরুণকে লেখা এক চিঠিতে সুকান্ত বলেছেন….। “একদিন হয়তো এ পৃথিবীতে থাকবো না,….সত্যি অরুণ বড় ভাল লেগেছিল পৃথিবীর স্নেহ, আমার ছোট্ট পৃথিবী করুণা। বাঁচতে ইচ্ছা করে,…”মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে।” কিন্তু মৃত্যু ঘনিয়ে আসছে….আবার পৃথিবীতে বসন্ত আসবে, গাছে ফুল, ফুটবে। শুধু তখন থাকব না আমি,”

অন্য একটা চিঠিতে সুকান্ত লিখেছেন তাঁর বন্ধু অরুণকে, ‘ডাক্তার আমাকে শয্যাগত করে রেখেছে….আমি নিরুপায়।’ ২৮-১০-৪৪ সুকান্ত লিখেছেন যে, ম্যালেরিয়া তাকে প্রায় নির্জীব করে তুলেছে, আমি এখানে (বেনারস সিটি) আসার পঞ্চম দিনে তারই কবলে পড়ে…আর শরীর এখন খুবই দুর্বল,…তোকে রীমিমত কষ্ট করেই লিখতে হচ্ছে । আর লিখতে পারছি না।”

২০-১১-৪৪ বেনারস সিটি থেকে সুকান্ত অরুণকে লিখেছেন-“শুনে বোধহয় দুঃখিত হবি যে, আমি আবার অসুখে পড়েছি;…বেলেঘাটায় ফিরে যেতে আশঙ্কা হচ্ছে । কেননা বেলেঘাটাই ম্যালেরিয়া সাম্রাজ্যের রাজধানী। আর আমি ম্যালেরিয়ার রোগী হয়ে কি সেখানে প্রবেশ করতে পারি?”

৮-৪-১৯৪৭, যাদবপুর টিবি হাসপাতাল থেকে সুকান্ত অরুণকে লিখেছেন-সাত দিন হয়ে গেল এখানে এসেছি। বড় একা একা ঠেকছে এখানে। সারাদিন চুপচাপ কাটাতে হয়। বিকেলে কেউ এলে আনন্দে অধীর হয়ে পড়ি। মেজদা নিয়মিত আসে, কিন্তু সুভাষ নিয়মিত আসে না।…রীতিমত কষ্ট পাচ্ছি।…সুযোগ পেলেই আমার সঙ্গে দেখা করবি ।…এখানে ‘লেডী মেরী হার্বার্ট ব্লক’ এক নম্বর বেডে আছি ।”

বন্ধু অরুণের মা সরলা বসুকে এক চিঠিতে সুকান্ত লিখেছিলেন, ‘দুর্নিবার গ্লানিতে আমি ডুবে যাচ্ছি।’ ২০-৩-৪৭ তারিখে আবার লিখছেন, “মা, আপনার পত্রাংশ ঠিক সময়েই পেয়েছিলাম । উত্তর দিতে দেরী হল। কারণ, সেই সময় আমি অত্যন্ত অসুস্থ ছিলাম।…দিনরাত পেটের যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিলাম। এখন ওষুধ খেয়ে অনেকটা ভাল আছি। শিগগিরই যাদবপুর যক্ষ্মা হাসপাতালে ভর্তি হব।” ২৫-৩-১৯৪৭ লিখেছেন-“আপনার কথা মত পাতাটা সঙ্গেই রেখেছি। তবে বেটে খাওয়া সম্ভব হল না। আবার আমার পেটের অসুখ” ও পেটের যন্ত্রণা শুরু হয়েছে।…দিন সাতেকের মধ্যেই হাসপাতালে যাবো।”

২০, নারকেল ডাংগা মেইনরোড, ২৮ জ্যৈষ্ঠ ১৩৫৩ দুপুরে, কলকাতা থেকে সুকান্ত তোমার হলো শুরু আমার হলো সাড়া” শিরোনাম দিয়ে বন্ধু অরুণকে এক সুদীর্ঘ চিঠি লিখেন । তার অংশবিশেষ হল, “আমার খবরঃ শরীর মন দুই-ই দুর্বল। অবিশ্রান্ত প্রবঞ্চনার আঘাতে মানুষ যে সময় পৃথিবীর উপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে ওঠে, ঠিক সেই সময় এসেছে আমার জীবনে।…আজকাল চারিদিকে কেবল হতাশার শকুনি উড়তে দেখছি।…গত বছরের আগের বছর থেকে শরীর বিশেষভাবে স্বাস্থ্যহীন হবার পর বিশ্রাম পাইনি ভালো মতো । একান্ত প্রয়োজনীয় বায়ু পরিবর্তনও ঘটেনি আমার সময় ও অর্থের অভাবে।…হঠাৎ গত সপ্তাহে হৃদযন্ত্রের দুর্বলতায় শয্যা নিলুম।… দেড়মাস…খাটুনির পর পুরস্কার হিসেবে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পেলুম খরচের জন্যে পাঁচটি টাকা। আর পেলুম চারদিনের জন্যে পার্টি হাসপাতালের ‘ওষুধ পথ্য হীন’ কোমল শয্যা। এতবড় পরিহাসের সম্মুখীন জীবনে আর কখনো হইনি। একান্ত অসহায় আমি?…কেবলই অনুভব করছি টাকার প্রয়োজন।…সুতরাং অভাবে কেবলই নিরর্থক মনে হচ্ছে জীবনটা।”

১৬ এপ্রিল, ১৯৩৯ বেলেঘাটা থেকে ভুপেনকে লিখছেন সুকান্ত, “আশার চিতায় আমার মৃত্যুর দিন সন্নিকট।…আমার ধ্বংস অনিবার্য।…অবসাদের শূন্যতা জানিয়ে দেয় পথ অনেক কিন্তু পেট্রোল নেই।”

৩-১০-৪৬ রেইড-এইউকিউর হোম, কলকাতা-১৬ থেকে ভুপেনকে সুকান্ত লিখেছেন-“অসুখের মধ্যে চিঠি পেলেও চিঠি লিখতে ভালই লাগে । যদিও আমার একশ’র ওপর জ্বর…।

৪-১২-৪৬, কলকাতা-১১ থেকে সুকান্ত ভুপেনকে লিখছেন, “আমার রোগ এমন একটা বিশেষ সন্দেহজনক অবস্থায় পৌঁছেছে, যা শুনলে তুই আবার ‘চোখে বিশেষ এক ধরনের ফুল’ দেখতে পারিস। ডাক্তারের নির্দেশে সম্পূর্ণ শয্যাগত আছি।”

১২-৯-৪৬ ‘রেড এড কিওর হোম’ থেকে লিখেছেন, ‘তিন সপ্তাহ ধরে জ্বরে ভুগছি।’

কবিতায়, গানে, চিঠিতে এত মরণের কথা থাকলেও সুকান্ত মরতে চাননি। বাঁচতে চেয়েছিলেন। আর তিনি বেঁচে থাকবেনই-এ বদ্ধমূল ধারণাও তাঁর ছিল। তাই তিনি নিজেই নিজেকে ‘ভাবী বনস্পতি’ বলেছেন। বলেছেন তাঁর জয়ের কথা, ‘হে পৃথিবী’ কবিতায়-

“তবু তো পথের পাশে
পাশে প্রতি ঘাসে ঘাসে
লেগেছে বিস্ময়!
সেই মোর জয়।”

মৃত্যুকে সামনে উপস্থিত দেখেও ভয় পাবার পাত্র নন সুকান্ত। তাঁর অশান্ত মনে যে সদাসর্বদা বিপ্লবই বিরাজ করে! ‘বুদ্বুদমাত্র’ কবিতায় তাই বলেছেন-

“মৃত্যুকে ভুলেছ তুমি তাই,
তোমার অশান্ত মনে বিপ্লব বিরাজে সর্বদাই ৷’
ঘুম ভাংগার গানে তাঁর আহ্বান,
“মাথা তোল তুমি বিন্ধ্যাচল,
মোছ উদ্‌গত অশ্রুজল
যে গেল সে গেল, ভেবে কি ফল?
ভোল ক্ষত!”

মৃত্যুকে যেমন সুকান্ত প্রত্যক্ষ করেছেন অতৃপ্ত তৃষ্ণা নিয়ে, তেমনি মৃত্যুর জয়গান বা স্বার্থকতা বর্ণনায়ও সিদ্ধহস্ত তিনি। ‘যাত্রা’ (আবৃত্তি) তার বড় প্রমাণ-

“কালস্রোত ভেসে যায় জীবন যৌবন ধন-মান’/তবু তুমি শিল্পীর তুলিকা নিয়ে করেছ অংকিত/সভ্যতার প্রত্যেক সম্পদ, সুন্দরের সুন্দর অর্চনা।/বিশ্বের প্রদর্শনী মাঝে উজ্জ্বল তোমার সৃষ্টিগুলি/পৃথিবীর বিরাট সম্পদ। স্রষ্টা তুমি, দ্রষ্টা তুমি/নতুন পথের। সেই তুমি আজ পথে পথে,/ প্রয়ানের অস্পষ্ট পরিহাসে আমাদের করেছ/উন্মাদ। চেয়ে দেখি চিতা তব জ্বলে যায় অসহ্য/দাহনে, জ্বলে যায় ধীরে ধীরে প্রত্যেক অন্তর ।/তুমি কবি; তুমি শিল্পী, তুমি যে বিরাট, অভিনব’/সবারে কাঁদায়ে যাও চুপি একী লীলা তব ।”

মৃত্যু সব কিছুই শেষ করে দেয় না। দিতে পারে না। তাই সুকান্তর এই চৈত্র দিনের গান-

“ভবিষ্যতের পানে চল আলোর গান গেয়ে।

তারে তুমি মহান করে তোলো,
তোমার পিছে মৃত্যুমাখা দিনগুলিরে ভোল।”

কেন এ ভুলবার কথা? কেন এই সান্ত্বনার বাণী? মৃত্যু কেন মহীয়ান?-এ সকল প্রশ্নের উত্তর সুকান্তর চিঠিপত্রগুলো ঘাঁটাঘাঁটি করলেও পাওয়া যায়। ২৪শে পৌষ, ৪৮ বন্ধু অরুণকে লেখা এক চিঠিতে সুকান্ত লিখেছেন, “তবু ত জীবন দিয়ে এক নতুনকে সার্থক করে গেলাম।…এই আমার আজকের সান্ত্বনা ।

সুকান্ত জীবন ও সাহিত্য সম্পর্কে ছিলেন আশাবাদী। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে তিনি সৃষ্টি করে গেছেন মহৎ সাহিত্য।

আরও পড়ুনঃ মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনচরিত | বাংলা সাহিত্যে অবদান | জীবনী

তথ্যসূত্রঃ 
১. ১৩৫৪ সালের ‘পরিচয় শারদীয়'তে শ্রীযুক্ত জগদীশ ভট্টাচার্য কর্তৃক লিখিত কবি কিশোর নামক প্রবন্ধের অংশবিশেষ।
২. বদরুদ্দীন উমর, ২৫শে বৈশাখ, ১৩৭৭, ঢাকা।
৩. বন্ধু অরুণাচলকে লেখা সুকান্তের দীর্ঘতম এক ঐতিহাসিক চিঠির অংশবিশেষ।
৪. মার্কসীয় অর্থনীতির মূল সূত্র : এল. লিয়ন তিয়েভ।
৫. সাহিত্য চর্চা, বুদ্ধদেব বসু ।
৬. রবি রশ্মি। চারু চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় এম. এ.।
৭. বাংলা সাহিত্যের খসড়া। শ্রী প্রিয় রঞ্জন সেন।
৮. সুকান্ত কবি ও মানুষ। সামাদ সিকদার। (ভূমিকার ক্ষেত্রে সামাদ সিকদারের সুকান্ত কবি ও মানুষ বইটি অনেক জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে। সামাদ সিকদারের কাছে ঋণ স্বীকার করছি।)
Tags:
x
error: Content is protected !!