Ami Poddoja Part 33 | আমি পদ্মজা পর্ব ৩৩ ইলমা বেহরোজ

Ami Poddoja Part 33 Elma Behrouz | আমি পদ্মজা পর্ব ৩৩ ইলমা বেহরোজ

Ami Poddoja Part 32 Elma Behrouz | আমি পদ্মজা পর্ব ৩২ ইলমা বেহরোজ

আমি পদ্মজা – ৩৩

_________________

ফজরের আযান চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই পদ্মজা চোখ খুলে। বিছানা থেকে নামার জন্য উঠার চেষ্টা করল,পারল না। আমির দুই হাতে জাপটে ধরে রেখেছে। পদ্মজা আমিরকে মৃদু কণ্ঠে ডাকল, ‘এইযে, শুনছেন?’

আমির সাড়া দিল না। আবার ডাকল পদ্মজা। আমির ঘুমের ঘোরে কিছু একটা বিড়বিড় করে আবার ঘুমে তলিয়ে যায়। এবার পদ্মজা উঁচু স্বরে ডাকল, ‘আরে উঠুন না। ফজরের নামায পড়বেন। এই যে…’

আমির পিটপিট করে তাকায়। দুই হাতের বাঁধন আগলা করে দেয়। পদ্মজা আমিরকে ঠেলে দ্রুত উঠে বসে। বিছানা থেকে নামতে নামতে বলে,’অজু করতে আসুন। আপনি আমাকে কথা দিয়েছিলেন আজ থেকে নামায পড়বেন।’

পদ্মজা কলপাড় থেকে অজু করে আসে। এসে দেখে আমির বালিশ জড়িয়ে ধরে আয়েশ করে ঘুমাচ্ছে। মৃদু হেসে কপাল চাপড়াল পদ্মজা। এরপর আমিরের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। আমিরের চুলে বিলি কেটে দিয়ে কোমল কণ্ঠে বলল, ‘উঠুন না। নামায পড়ে আবার ঘুমাবেন। মসজিদে যেতে হবে না। আমার সাথেই পড়ুন। এই যে, শুনছেন? এইযে, বাবু…”

পদ্মজা দ্রুত জিভ কাটল। মুখ ফসকে আমিরের ডাক নাম ধরে সে ডেকেছে। পদ্মজা সাবধানে পরখ করে দেখল,আমির শুনলো নাকি। না শুনেনি। পদ্মজা মনে মনে বলল,’ উফ! বাঁচা গেল।’

আরো এক দফা ডাকার পর আমির উঠে বসে। কাঁদোকাঁদো হয়ে বার বার অনুরোধ করে,’কাল থেকে পড়ব। আজ ঘুমাতে দাও।’

পদ্মজা শুনলো না। তার অনুনয়ের কাছে আমির হেরে গেল। বউ যদি সুন্দরী হয় তার অনুরোধ কী ফেলা যায়? আমির কলপাড় থেকে অজু করে আসে। দুজন পাশাপাশি দুই জায়নামাযে নামায সম্পন্ন করে।

নামায শেষ হতেই পদ্মজা বলল,’এবার চলুন।’

আমির টুপি বিছানার উপর রেখে জানতে চাইল,’কোথায়?’

‘এমনভাবে বলছেন,যেন জানেন না।’ একটু অভিনয় করেই বলল পদ্মজা।

আমিরের সত্যি কিছু মনে পড়ছে না। এখনো চোখে ঘুম ঘুম ভাব বলেই হয়তো। সে মনে করার চেষ্টা করল। মনে পড়তেই বলল, ‘ওহ! দাঁড়াও। চাবি নিয়ে আসছি।’

আমির বেরিয়ে গেল। পদ্মজা অপেক্ষা করতে থাকল। জানালার পাশে দাঁড়াতেই ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে সর্বাঙ্গ চাঙ্গা হয়ে উঠল। বাইরে সবেমাত্র ভোরের আলো ফুটেছে। পদ্মজা চমৎকার চাহনিতে দেখছে বাড়ির পিছনের জঙ্গল। কী সুন্দর সবকিছু! এতো এতো গাছ। অযত্নে গড়ে উঠা বন-জঙ্গল যেন একটু বেশি আকর্ষণীয় হয়।

প্রকৃতির রূপ দেখতে দেখতে আচমকা চোখে পড়ল রানিকে। রানির পরনে আকাশি রঙের সালোয়ার-কামিজ। সে জঙ্গলের ভেতরে যাচ্ছে। চোর চুরি করার সময় যেভাবে চারপাশ দেখে রানিও ঠিক সেভাবেই চারপাশ দেখে দেখে এগোচ্ছে। পদ্মজা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পুরো দৃশ্যটা দেখল। রানি গভীর জঙ্গলের আড়ালে চলে যায়। তখনি আমির আসে,’পদ্মবতী? ‘

আমিরের ডাকে পদ্মজা মৃদু কেঁপে উঠল। আমির কপাল কুঁচকে প্রশ্ন করল, ‘কিছু কী হয়েছে?’

‘না,কী হবে। চলুন আমরা যাই।’

পদ্মজা যে কোনো কথা এড়িয়ে গেছে তা বেশ বুঝতে পারল আমির। তবে প্রশ্ন করল না। পদ্মজা আমিরকে রানির কথা বলতে গিয়েও পারল না। সে ভাবছে, ‘আগে রানি আপাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে। এখনি বলা ঠিক হবে না। উনি কী ভাবেন আবার।’

____________

রুম্পার ঘরের দরজা খুলতেই ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ হয়। পদ্মজা ঘরে ঢুকে আগে জানালা খুলে দেয়। তারপর পালঙ্কের দিকে তাকাল। পালঙ্ক শূন্য। পদ্মজা আমিরের দিকে জিজ্ঞাসু হয়ে তাকায়। আমির ইশারা করে পালঙ্কের নিচে দেখতে। পদ্মজা ঝুঁকে পালঙ্কের নিচে তাকাল। কেউ একজন শুয়ে আছে। চুল দিয়ে মুখ ঢাকা। হাতে পায়ে বেড়ি বাঁধা।

আমির পদ্মজার পাশে বসে বলল,’উনিই রুম্পা ভাবি।’

‘উনাকে ডাকবেন একটু?’

‘রেগে যায় যদি?’

‘তবুও ডাকুন না।’

আমির লম্বা করে নিঃশ্বাস নিয়ে ডাকল, ‘ভাবি? ভাবি? শুনছেন ভাবি?”

রুম্পা নড়েচড়ে চোখ তুলে তাকায়। দুই হাত দূরে একটা ছেলে ও মেয়ে বসে আছে। তাদের মুখ স্পষ্ট নয়। আলো ভালো করে ঘরে ঢুকেনি। রুম্পা শান্ত চোখে চেয়ে রইল অনেকক্ষণ। পদ্মজা হাত বাড়িয়ে বলল,’আমার হাতে ধরে বেরিয়ে আসুন।’

রুম্পা বাঁধা দুই হাতে পদ্মজার হাত ধরার চেষ্টা করে,পারল না। পদ্মজা আরেকটু এগিয়ে যায়। রুম্পার দুই হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে আসে। রুম্পা কাছে আসতেই দুর্গন্ধে পদ্মজার বমি চলে আসে। গলা অবধি এসে বমি আটকে গেছে। না জানি কতদিন গোসল করেনি রুম্পা! দাত মাজেনি। এই বাড়ির কেউ কী একটু পরিষ্কার করে রাখতে পারে না রুম্পাকে? পস্রাবের গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে। মনে হচ্ছে ঘরেই পস্রাব-পায়খানা করে।

রুম্পা মলিন মুখে চেয়ে থাকে পদ্মজার দিকে। শান্ত,স্থির দৃষ্টি। আমির গর্ব করে রুম্পাকে বলল,’আমার বউ। বলছিলাম না, সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা আমার বউ হবে। দেখিয়ে দিলাম তো?’

রুম্পা হাসে। ময়লাটে মলিন মুখের হাসি বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর হাসি। অনেকদিন গোসল না করার কারণে চেহারা, হাত,পা ময়লাটে হয়ে গেছে। নখগুলো বড় বড়। নখের ভেতর ময়লার স্তূপ যেন। ঠোঁট ফেটে চৌচির। টলমল করা চোখ। দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুণি চোখ দিয়ে বর্ষণ বইবে। রুম্পা পদ্মজাকে শান্ত কণ্ঠে বলল,’এ তো ম্যালা সুন্দর ছেড়ি। তোমার নাম কিতা?’

পদ্মজা খুশিতে জবাব দিল,’উম্মে পদ্মজা।’

‘ছুডু ভাই,এতো সুন্দর ছেড়ি কই পাইলেন? এ…এ যে চান্দের লাকান মুখ।’

রুম্পার আরো কাছে এসে বসল পদ্মজা। দুর্গন্ধটা আর নাকে লাগছে না। মানুষটাকে তার বেশ লাগছে। রুম্পার চুল লম্বা। মাটিতে পাঁচ-ছয় ইঞ্চি চুল লুটিয়ে আছে। কুচকুচে কালো চুল। অনেকদিন চুল না ধোয়ার কারণে চুলগুলো জট লেগে আছে কিন্তু সৌন্দর্য এখনো রয়ে গেছে। যখন সুস্থ ছিল নিশ্চয় অনেক বেশি সুন্দর চুলের অধিকারিণী ছিল।

পদ্মজা বলল, ‘আমি আপনাকে তুমি বলি?’

রুম্পা দাঁত বের করে হেসে মাথা নাড়াল। পদ্মজা হেসে বলল,’কিছু বলবেন?’

রুম্পা হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে থাকে পদ্মজার দিকে। কোনো জবাব দেয় না। সেকেন্ড কয়েক পর রুম্পার চোখের দৃষ্টি এদিক-ওদিক ছুটতে থাকে। হাসি মিলিয়ে মুখ মলিন হয়ে আসে। পদ্মজা অবাক হয়ে রুম্পার পরিবর্তন দেখে। আকস্মিক পদ্মজাকে আক্রমণ করে বসল রুম্পা। খামচে ধরে পদ্মজার পা। আমির লাফিয়ে উঠে। রুম্পার হাত থেকে পদ্মজাকে ছুটাতে চেষ্টা করে। রুম্পা পা ছেড়ে পদ্মজার শাড়ি কামড়ে ধরে। মুখ দিয়ে অদ্ভুত শব্দ করতে থাকে। আমির ধমকে বলে,’ভাবি ছাড়ো বলছি। পদ্মজা তোমার ক্ষতি করতে আসেনি। ভাবি ছাড়ো।’

পদ্মজা স্তব্ধ হয়ে দেখছে। তার চোখেমুখে কোনো ভয়ভীতি নেই। কী যেন খুঁজছে রুম্পার মধ্যে। খুঁজে কূলকিনারা পাচ্ছে না। রুম্পা শাড়ি ছেড়ে দিতেই পদ্মজা একটু পিছিয়ে যায়। দরজায় চোখ পড়ে। দেখতে পায়, কেউ একজন সরে গিয়েছে। কী আশ্চর্য! হুট করেই পদ্মজার বুক কাঁপতে থাকে। নূরজাহান নিজ ঘর থেকে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসেন। এসেই বলেন, ‘তালা খুলছে কেডায়? বাবু, নতুন বউরে নিয়া এইহানে আইছোস কেন?’

আমির দ্রুত রুম্পার কাছ থেকে সরে আসে। নূরজাহানকে কৈফিয়ত দেয়, ‘ভাবলাম, বাড়ির সবাইকে পদ্মজা দেখেছে। রুম্পা ভাবিকেও দেখুক। ভাবতে পারিনি ভাবি এমন কাজ করবে। ভাবি তো এখন আরো বেশি বিগড়ে গেছে দাদু।’

‘তুই আমারে কইয়া আইবি না? তোর চিল্লানি হুইননা আমার কইলজাডা উইড়া গেছিলো। বউ তোমারে দুঃখ দিছে এই ছেড়ি?’

পদ্মজা বলল, ‘না,না। কিছু করেনি আমার।’

আমির চেঁচিয়ে উঠল, ‘কী বলছো? কিছু করেনি মানে? হাত দেখি?’

আমির পদ্মজার দুই হাত টেনে নিয়ে দেখে। বাম হাতে নখের জখম। আমির ব্যথিত স্বরে বলল, ‘ইশ! কতোটা আঘাত পেয়েছো। ঘরে চলো। দাদু এই নাও চাবি। তালা মেরে দিও।’

আমির পদ্মজাকে টেনে নিয়ে বেরিয়ে যায়। বেরোবার আগ মুহূর্তে পদ্মজা রুম্পার দিকে তাকাল। দেখতে পেল, রুম্পা আড়চোখে তাকে দেখছে। সে চোখে স্নেহমমতা! একটু হাসিও লেগে ছিল। পদ্মজার মাথা চক্কর দিয়ে উঠল।

ঘরে এসে আমিরকে বলল, ‘উনার যত্ন কেউ নেয় না কেন?’

‘দেখোনি কী রকম করল? এই ভয়েই কেউ যায় না। শুরুতে তোমাকে দেখে যদি রেগে যেতো তখনি তোমাকে নিয়ে চলে আসতাম। সবাইকে ভাবি তুই করে বলে। তোমাকে তুমি বলে সম্বোধন করতে দেখে ভাবলাম, বোধহয় তোমাকে পছন্দ হয়েছে। তাই আঘাতও করবে না। কিন্তু ধারণা ভুল হলো।’

‘আপনি অকারণে চাপ নিচ্ছেন। নখের দাগ বসেছে শুধু।’

‘রক্ত চলে এসেছে।’

‘এইটুকু ব্যাপার না।’

আমির তুলা দিয়ে পদ্মজার হাতের রক্ত মুছে দিল। তারপর বলল, ‘আর ওইদিকে পা দিবে না।’

‘আম্মার কণ্ঠ শোনা যাচ্ছে।’

‘লাবণ্যকে ঘুম থেকে তুলছে। লাবণ্য ফজরে উঠতেই চায় না।’ আমির হেসে বলল।

‘আমি যাই।’

‘কোথায়?’

‘আম্মা,সকাল সকাল রান্নাঘরে যেতে বলেছিলেন।’

‘তুমি রান্না করবে কেন?’

‘অনুরোধ এমন করবেন না, আমি আমার বাড়িতেও রান্না করেছি। টুকটাক কাজ করেছি। এখন না গেলে,আম্মা রেগে যাবেন। রাগানো ঠিক হবে না।’

‘এসব ভালো লাগে না পদ্মজা।’

‘আমি আসছি।’

পদ্মজা ব্যস্ত পায়ে বেরিয়ে যায়। আমিরকে কথা বলার সুযোগ না দিয়ে।

চলবে…. Ami Poddoja Part 34 Elma Behrouz | আমি পদ্মজা পর্ব ৩৪ ইলমা বেহরোজ

আমি পদ্মজা ইলমা বেহরোজ সম্পূর্ণ উপন্যাস পিডিএফ | Ami Padmaja Elma Behrouz Full Story PDF Download

Did you able to download this book?

YES
NO
Thanks for staying with us.