Skip to content
Home » আমার দেখা নয়াচীন রিভিউ পিডিএফ | শেখ মুজিবুর রহমান PDF

আমার দেখা নয়াচীন রিভিউ পিডিএফ | শেখ মুজিবুর রহমান PDF

আমার দেখা নয়া চীন PDF রিভিউ Amar Dekha Noya Chin Review

বই : আমার দেখা নয়াচীন
লেখক : শেখ মুজিবুর রহমান
প্রকাশনী : বাংলা একাডেমি
মুদ্রিত মূল্য : ৪০০ ৳
মোট পৃষ্ঠা : ১৯৯
প্রকাশ : ফেব্রুয়ারি ২০২০
রিভিউদাতা : সাইক

‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের লেখক স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কীর্তি, আত্মত্যাগ ও গৌরবগাঁথা সম্পর্কে পুরো বিশ্বের বিদগ্ধজন বিদিত। তাঁর রচিত অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও ‘কারাগারের রোজনামচা‘ গ্রন্থ দুটিতে তাঁর জীবনের সেইসব কঠোর সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারির একুশে বইমেলাতে মুজিব শতবার্ষিকী উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছিল লেখকের লেখা ‘আমার দেখা নয়াচীন’ বইটি। তবে সবচেয়ে চমকপ্রদ ব্যাপার এই যে, সেই বছর একুশে বইমেলাতে বঙ্গবন্ধুর লেখা এই বইটি ত্রিশ হাজারের অধিক বিক্রয় হয়ে সর্বোচ্চ বই বিক্রয়ের রেকর্ড গড়েছিল এই বইটি।

১৯৪৮ সাল থেকে বঙ্গবন্ধুকে মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে বারবার কারাবরণ করতে হয়। এরপর ১৯৫২ সালে কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন চীনের পিকিং শহরে অনুষ্ঠিত হওয়া পিস কনফারেন্স অব দি এশিয়ান এন্ড প্যাসিফিক রিজিওন্স-এ। সে সময় তিনি চীন নামে নতুন স্বাধীন হওয়া একটি দেশকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে আবারো তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। সে সময় জেলের অন্ধকারের নীরবে নিভৃতে তাঁর চীনের সেই স্মৃতিনির্ভর ভ্রমণ কাহিনী ও অভিজ্ঞতা বিবৃত করে তিনি এই গ্রন্থটি রচনা করেন।

দীর্ঘ চার বছর জেল খেটে আসার পর ৩২ বছর বয়সী তরুণ মুজিবের কাছে চীন দর্শনের সুযোগ আসে। কিন্তু তাঁর কাছে তখন পাসপোর্ট ছিল না। আর সে সময় পাসপোর্ট তৈরি করা মোটেও সহজলভ্য ব্যাপার ছিল না। পাসপোর্টের জন্য সে সময় তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে আবেদনপত্র পেশ করতে হত। তারপর অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে লাভ করা যেত বহু আকাঙ্ক্ষিত পাসপোর্ট। কিন্তু এদিকে ১৯৫২ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারি জেল থেকে মুক্তি পাবার পর বঙ্গবন্ধু বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর একটু সুস্থ হয়ে একই বছরের অক্টোবর মাসে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার পর পাসপোর্ট হাতে পেয়ে তিনি সফরসঙ্গীদের সাথে পাড়ি দেন চীন নামে সে সময় গঠিত হওয়া ষাট কোটি মানুষের এক নতুন রাষ্ট্রে।

আরও পড়ুনঃ শেখ মুজিব আমার পিতা PDF বই রিভিউ গ্রন্থ সমালোচনা | শেখ হাসিনা

চীনে পৌঁছানোর পূর্বে তাঁকে ভিনদেশের আরো তিনটি স্থানে যাত্রাবিরতি নিতে হয়। উক্ত তিনটি স্খান যথাক্রমে ব্রহ্মদেশের (মায়ানমার) রেঙ্গুন এবং থাইল্যান্ডের ব্যাংকক ও হংকং। এসব স্থানে তিনি বেশি সময় অবস্থান না করলেও, এসব স্থানের বর্ণনা ও অভিজ্ঞতাও লেখক লিপিবদ্ধ করেছেন এই বইতে। ব্রহ্মদেশের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে লেখক এই বইয়ের ২২ পৃষ্ঠায় লিখেছেন:-

“যতদূর খবর নিয়ে জানলাম, ব্রহ্মদেশের অবস্থা খুবই খারাপ। বিপ্লবীরা বহুস্থান দখল করে আছে, আর মাঝে মাঝেই রেঙ্গুন শহরের পানি বন্ধ করে দেয়।”

পরেরদিন সন্ধ্যায় তিনি চীনের ক্যান্টন পৌঁছান এবং সঙ্গী-সাথীদের সাথে সেখানের একটা হোটেলে ওঠেন। এরপর থেকে এই বইয়ে তিনি চীনের বর্ণনা শুরু করেছেন। শান্তি সম্মেলনে অংশ নেওয়ার পর সেখানকার রাষ্ট্রনায়কদের সাথে সাক্ষাৎ করা এবং তাঁদের বক্তৃতার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা উল্লিখিত করেছেন। শুধু তাই নয়, তিনি বাইরে বেরিয়ে সেখানকার স্থানীয় লোকদের সাথে কথা বলে জানার চেষ্টা করেছেন নতুন চীনের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা সম্পর্কে এবং সেগুলো উল্লেখ করেছেন এই বইতে।

চীন স্বাধীনতা লাভের পূর্বে সেখানে খুন,ডাকাতি,বেশ্যাবৃত্তি ও বেকার সমস্যার মত বেশকিছু সমস্যা ছিল। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসবের বেশ কিছু সমস্যার সমাধান আশ্চর্যজনকভাবে করে ফেলে চীন। এছাড়া, চীন দর্শনের পূর্বে তিনি শুনেছিলেন, এই দেশটি নাকি মুসলমানের প্রতি এবং তাদের স্বাধীনভাবে ধর্ম পালন করতে দেওয়ার প্রতি খুবই নির্দয়। এই কথাটি আসলে কতটুকু সত্য, সেটা উদঘাটনেও তিনি ছিলেন বদ্ধপরিকর এবং এ সম্পর্কেও তিনি অনেক কথা লিখেছেন এই বইতে।

আরও পড়ুনঃ অসমাপ্ত আত্মজীবনী রিভিউ PDF | শেখ মুজিবুর রহমান

লেখকের ভ্রমণকালে বিভিন্ন স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনাও দেওয়া হয়েছে খুব চমৎকারভাবে, যা পড়ার পর প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো স্বচ্ছ জলের মত ভেসে উঠেছে আমার চোখের সামনে। কিন্তু তবুও লেখক এই বইয়ের ২৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন:-

“আমি লেখক নই, আমার ভাষা নাই, তাই সৌন্দর্যটা অনুভব করতে পারছি, কিন্তু গোছাইয়া লেখতে পারি না। পাঠকবৃন্দ আমায় ক্ষমা করবেন।”

বঙ্গবন্ধুর এই উদারচেতা বাক্য থেকে সহজেই অনুমেয় যে, তাঁর দর্শনীয় সেসব প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো কত না সুন্দর ছিল!

তিনি যে শুধু এই বইতে চীন ভ্রমণের বিরস বর্ণনা দিয়ে গিয়েছেন, তা নয়। রয়েছে তাঁর সফরসঙ্গীদের সাথে ঘটা হাস্যরসাত্মক বর্ণনাও। রাস্তা দিয়ে হাঁটার সময় বঙ্গবন্ধুর একজন সফরসঙ্গী আতাউর রহমান সাহেবের কোটে হঠাৎ এসে একজন তরুণী মেয়ে গোলাপ ফুল গুঁজে দেয়। এর অর্থ মেয়েটি তাঁকে প্রেম নিবেদন করল। এমন ঘটনা দেখে বঙ্গবন্ধু আতাউর রহমান সাহেবকে কৌতুক ছলে জিজ্ঞাসা করে বলেন, “আমাদের মত যুবকদের দিকে নজর না পড়ে আপনার ওপর পড়ার কারণ কি?”

এছাড়া, বঙ্গবন্ধুর আরেকজন সফরসঙ্গী দৈনিক ইত্তেফাকের সম্পাদক মানিক ভাইয়ের ভোজনরসের বিবরণ, পাঠকের মুখে হাসির লহর বইয়ে দেবে।

আরও পড়ুনঃ কারাগারের রোজনামচা সারমর্ম | বই রিভিউ | শেখ মুজিবুর রহমান PDF

এই বইটির ভূমিকা রচনা করেছেন, গ্রন্থের লেখক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য কন্যা, আমাদের দেশের বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি এই বইটি সম্পর্কে তাঁর অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেছেন:-

“এই ভ্রমণকাহিনি যতবার পড়েছি আমার ততবারই মনে হয়েছে যে তিনি গভীর পর্যবেক্ষণ করেছেন প্রতিটি ক্ষেত্রে। তার কারণ হলাে তাঁর ভিতরে যে সুপ্ত বাসনা ছিল বাংলার মানুষের মুক্তির আন্দোলন ও স্বাধীনতা অর্জন সেটাই বারবার ফুটে উঠেছে আমার মনে , এ-কথাটাও অনুভব করেছি।”

এছাড়া, বইয়ের শেষে বঙ্গবন্ধুর চীন ভ্রমণের বেশ কিছু ছবি সংযোজিত হয়েছে, যা বইটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে।

পরিশেষে বলব, পুরো পৃথিবী আজ করোনা ভাইরাসের মহামারী প্রাদুর্ভাবে জর্জরিত ও দিশেহারা। আমরা সকলেই অবগত যে, এই ভয়ংকর ভাইরাসের উদ্ভব হয়েছে চীনের হুবেই প্রদেশের উহান শহরে। এরপর থেকে চীন দেশ সম্পর্কে আমাদের সকলের জানার আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তাদের কৃষ্টি-কালচার ও খাদ্যাভ্যাসের কারণে কমবেশি আমাদের প্রত্যেকের মনে একটা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু চীনের গোড়ার দিকের ইতিহাস ছিল সম্পূর্ণ অন্যরকম, যা আমাদের চীনের প্রতি তৈরি হওয়া বর্তমান ধারণার পরিবর্তন ঘটাবে। তাই, চীন দেশ সম্পর্কে জানার এই কৌতূহলকে উদ্দীপ্ত করার জন্য এই বইটি পড়া আমাদের প্রয়োজন

আরও পড়ুনঃ জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম-সনদ অথবা সার্টিফিকেটে নামের ভুল সংশোধন


সংক্ষেপে বই আলোচনা

বইটির আলোচনাকাল শেখ মুজিবুর রহমান যখন ১৯৫২ সালের অক্টোবরের ০২-১২ তারিখ পর্যন্ত চীনে অবস্থান করেছেন। এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সন্মেলনে অংশগ্রহণ করার জন্য পাকিস্তানের যে প্রতিনিধিদল চীনে গিয়েছে তাদের একজন ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৫৪ সালে যখন বইটি লিখেছেন তখন লেখক জেলে ছিলেন। ১৯৫৭ সালেও একবার চীনে গিয়েছেন সরকারের শ্রমমন্ত্রী থাকাকালে। বইটিতে লেখকের ব্যক্তিগত জীবন, রাজনৈতিক জীবন, ব্যক্তিগত ভাবাদর্শ তুলে ধরেন নি। তার দেখা চীনের বিপ্লব পরবর্তী সময়ের ‘নয়া চীন’ এর পরিবর্তনের ইতিহাসই মূলত বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে।

মাও সে-তুং এর কম্যুনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সদ্য বিপ্লবোত্তর একটি দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা, শাসনব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, জীবনচিত্র ও সামাজিক পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।

শান্তি সম্মেলনে মোট ৩৭ টি দেশ অংশগ্রহণ করেছে তারমধ্যে পাকিস্তানও ছিলো। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের অন্য সদস্যরা হলো আতাউর রহমান, তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস ও ইউসুফ হাসান। শেখ মুজিবই ছিলেন সকলের ছোট। ওই সময় শেখ মুজিবের নিজের কোনো পাসপোর্ট ছিলো না। তৎকালীন আওয়ামী মুসলিম লীগের কোষাধ্যক্ষ ইয়ার মোহাম্মদ খানের সহযোগিতায় তড়িঘড়ি করে পাসপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। পাসপোর্ট পাওয়ার পরে দেখা গেলো পাকিস্তানের পাসপোর্টে লেখা পাকিস্তানি ব্রিটিশ নাগরিক।

কয়েকটি দেশে বিশ্রাম করে তার পরে প্রতিনিধি দল চীন দেশে পৌঁছায়। সেটা ছিলো স্বল্প বিরতি।

আরও পড়ুনঃ বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে যে বইগুলো একবার হলেও পড়া উচিত | সেরা ৫০০ বইয়ের তালিকা

নয়াচীনে গিয়ে শেখ মুজিব দেখেছেন ও জেনেছেন যে শুধু আইন করে নয়। এগুলো বন্ধ করতে চাই সুষ্ঠু সামাজিক কর্মপন্থা, অর্থনৈতিক সংস্কার ও নৈতিক পরিবর্তন। চীন সরকার সেই মুতাবেক ভিক্ষাবৃত্তি দূরীকরণ, কুটিরশিল্প স্থাপনের মাধ্যমে বেকার সমস্যা দূরীকরণ, কৃষকদের মাঝে জমির সুষ্ঠু বন্টনের মাধ্যমে চাষাবাদ করে, চাকরি-বাসস্থানের মাধ্যমে বেশ্যাবৃত্তি দূর করা, জনগণকে আশ্বাস করে দুর্নীতি দূর করা, বীজ সহায়তার মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধি করা, জনগণকে সচেতনের মাধ্যমে সমাজের অনাচার ও অবিচার দূর করা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা, নারী ও পুরুষের সম-অধিকার দেওয়া, স্বাধীন ভাবে সকল ধর্মাবলম্বীদের ধর্ম চর্চায় রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করেছেন। এতে জনগণও সরকারকে যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করেছে।

এক সময় চীন দেশ মানেই বুঝতো আফিমখোর জাতি হিসাবে, ডাকাতির জন্য চীন পরিচিত ছিলো। চীন সরকার আইন করে আফিম খাওয়া ও ডাকাতি শূণ্যতে নিয়ে এসেছে। কিভাবে শূণ্যের কোটায় নিয়ে এনেছে তারও সুন্দর বর্ণনা করেছেন। পাশাপাশি বেশ্যাবৃত্তির বন্ধের ক্ষেত্রে পদ্ধতি ছিলো এমন যে– কয়েকজন বেশ্যাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে বিভিন্ন কাজ দিয়েছে তারপর তারাই অন্য বেশ্যাদেরকে তাদের নতুন জীবনের কল্যাণ দেখিয়ে-বুঝিয়ে বাকিদেরকে বেশ্যাবৃত্তি থেকে সরিয়ে এনেছে। কারণ ওই সময় বৃহত্তর সাংহাই শহরে ৪০ হাজার বেশ্যা ছিলো। কারণ তখন এঁদের কাজের মাধ্যমে সঠিক পথে আনাই ছিলো বড় চ্যালেঞ্জ। তার পরে সরকার তাদেরকে সাধারণ জীবনযাপনের সুযোগ সুবিধা দিয়েছে। একই ভাবে ভিক্ষুকদেরও বিভিন্ন কাজের বিনিময়ে বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে, খাওয়ার ব্যবস্থা করেছে। মোট কথা— একটি দেশ বা জাতি কি ভাবে উন্নতি করে। সকল কুসংস্কার, সকল অলসতা, সকল অসাড় গৌরবকে পেছনে ফেলে সঠিক কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে বিশ্বে একটি শ্রেষ্ঠ দেশ হিসেবে কি ভাবে আত্মপ্রকাশ করা যায় তা চীন করে দেখিয়েছে।

বইয়ের মাঝেমধ্যেই শেখ মুজিব বহু আক্ষেপ করে নিজ দেশ অর্থাৎ পাকিস্তানের সাথে নয়াচীনের তুলনা করার চেষ্টা করেছেন। জনগণ হিসেবে আমরা নিজেদের দেশপ্রেম, নীতি-নৈতিকতা ও মূল্যবোধ দিয়ে সরকারকে কতটুকু সাহায্য-সহযোগিতা করছি ও চীনের জনগণ কতটুকু করছে তা তুলে ধরেছেন।

শেখ মুজিবের ‘আমার দেখা নয়াচীন’ আমার কাছে অসাধারণ একটি বই বলে বিবেচ্য। আমার অনেক ভালো লেগেছে। বইটি পড়লে ঝিমুনি বা বিরক্ত লাগবে এমন ধাঁচে উপস্থাপন করা হয় নি। খুব স্পষ্ট ভাষায় ও সাবলীল ভঙ্গিতে লেখার কারণে সামনের ঘটনা জানার জন্য একজন পাঠক উদগ্রিব হবে বলে মনে করি।

লিখেছেনঃ মোঃ আশিকুর রহমান

আরও পড়ুনঃ সংস্কৃত নবরঙ্গ থেকে ইংরেজি Orange | কমলা | বাংলা ভাষার বিবর্তন


বুক রিভিউ : আমার দেখা নয়াচীন
লেখক: শেখ মুজিবুর রহমান
রিভিউ করেছেনঃ Anupom Majumder

১৯৫২ সালের ২-১২ অক্টোবর চীনের পিকিংয়ে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে যোগদান করেন।বঙ্গবন্ধু তার সফরকালে শান্তি সম্মেলন চলাকালীন এবং সম্মেলন শেষে নয়াচীনে ঘুরে ঘুরে যে ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তাই ‘আমার দেখা নয়াচীন’ ভ্রমণকাহিনীতে শৈল্পিক ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলেছেন। একজন পেশাদার লেখক না হওয়া সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবে ঘটনার বর্ণনা এবং ঘটনার প্রেক্ষাপটে পাকিস্তানের বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন তা অনবদ্য এবং যৌক্তিকতায় পূর্ণ।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫২ এবং ১৯৫৭ মোট দুই দফা চীন সফর করলেও মূলত ১৯৫২ সালের চীন সফরই এই গ্রন্থের আলোচ্য বিষয়।যদিও এই গ্রন্থের ভূমিকায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুটো সফরকেই গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে গ্রন্থের মহিমা এবং গুরুত্ব হাজার গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে এই গ্রন্থে ব্যবহৃত ১৯৫২ এবং ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধুর চীন সফরের মূল্যবান এবং দুর্লভ আলোকচিত্র। প্রায় শ’খানেক আলোকচিত্র তৎকালীন শান্তি সম্মেলন এবং বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন তৎপরতা নিপুণ ভাবে তুলে ধরার পাশাপাশি এ ব্যাপারে সকল প্রশ্নের জবাব পরোক্ষভাবে দেয়া হয়েছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চীন সফরের অংশ হিসেবে প্রথমে রেঙ্গুনে এবং তারপর হংকং পার হয়ে চীনে প্রবেশ করেন। স্বাভাবিক ভাবেই তখন রেঙ্গুনে যে অরাজকতা এবং বিশৃঙ্খলা চলছিল বিশেষ করে কারেন বিদ্রোহীদের অপতৎপরতার বর্ণনা দিয়েছেন। হংকং তখনও ইংরেজদের অধীনে থাকলেও সেখানকার বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের সাথে মিশে বঙ্গবন্ধু বুঝতে পারেন হংকং এর মানুষ গুলো খুব শান্তিতে না থাকলেও জিনিসের দাম খুবই সস্তা।

তৎকালীন পাকিস্তানের সাথে হংকংয়ের জিনিসের দামের একটা তুলনা করেছেন। যেমন-

পাকিস্তানে যে হাওয়াই শার্ট ৩০ টাকা সেটা পাকিস্তানি টাকায় হংকং এ ছয় টাকা।যে জ্যাকেট পাকিস্তানে ১০০ টাকা হংকং এ ২৪ টাকা।

বঙ্গবন্ধু তার সফরসঙ্গীদের নিয়ে চীনের ক্যান্টন শহরে প্রবেশ করেন। তারপর একে একে পিকিং,তিয়ানজিং,সাংহাই সফর করে যে তথ্য এবং ভ্রমণ অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তা আলোচনা করেছেন। তিনি বারবার বলতে চেয়েছেন ১৯৪৯ সালে কমুনিস্ট সরকার গঠন করার পর দেশটির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। বাইরে থেকে মানুষ কমুনিস্ট সরকার সম্পর্কে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য করলেও চীনে গিয়ে তার উল্টো অভিজ্ঞতা হয় শেখ মুজিবের।চীনে যে জাতিগত এবং ধর্মীয় বিষয় নিয়ে দাঙ্গা হত নতুন সরকারের সময় সবকিছুর পাল্টে গিয়েছে। মুসলিমরা মসজিদে নামাজ আদায় করছে,খ্রিস্ট্রানরা তাদের উপাসনা করছে বৌদ্ধরা কোন বাঁধা দিচ্ছে না।এমনকি সরকারের উচ্চ পর্যায় এবং সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদেও মুসলমানদের অন্তর্ভুক্তির কথা বঙ্গবন্ধু প্রকাশ করেছেন, যেটা তিন বছর আগেও কল্পনাতীত ছিল।

আরও পড়ুনঃ সিদ্ধান্তহীনতা দূর করার উপায় কি? আমরা কেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি?

৩৭ দেশের অংশ গ্রহণে অনুষ্ঠিত শান্তি সম্মেলনের আয়োজক চীনা সরকার কমুনিস্ট বিশ্বাসী হলেও অংশগহণকারী বেশিরভাগ ডেলিগেটই কমুনিস্ট ঘরানার ছিল না।তবুও তাদের মূল কথায় ছিল সবাই শান্তি চাই, কেউ যুদ্ধ চাই না।এই সময় বঙ্গবন্ধু অন্যান্য দেশের ডেলিগেটদের সাথেও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেন।কাশ্মীর নিয়ে গণভোটের বিষয়ে সম্মিলিত প্রস্তাব উত্থাপন করেন।চীনা সরকার এটাকে সমর্থন দেয়।মূলত তখন থেকেই চীন পাকিস্তানের সাথে সম্পর্ক উন্নয়নের ব্যাপারে অনেক আগ্রহী হয়ে ওঠে। যেটা এখনও দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান।

বঙ্গবন্ধু প্রায় ২৫ দিন চীনে অবস্থান করেন। এই সময়ে তিনি চীনের সাধারণ মানুষের সাথে মিশেছেন।বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের সাথে তিনি কথা বলেছেন। এ জন্য চীনের স্থানীয় বাজার, বড় বাজার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,শিক্ষা প্রতিষ্ঠান,রাস্তাঘাট,মুদি দোকান, বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরে বেড়ান।একটাই উদ্দেশ্য ছিল সকল শ্রেণির মানুষের মনের অবস্থা জানা এবং সরকার সম্পর্কে তাদের মনোভাব জানা।আশ্চর্যজনক হলেও সত্য প্রায় সকলেই কমুনিস্ট নেতা মাও সে তুং এবং তার সরকারের পক্ষে কথা বলেছে।যদিও বহির্বিশ্ব থেকে আমেরিকার প্রপাগান্ডা শুনে সবাই ভাবত কমুনিস্টরা জনগণকে অত্যাচার করছে।আমেরিকার এই মিথ্যা অপবাদের কারণে চীনারা তাদের খুবই ঘৃণা করত এবং একমাত্র শত্রু মনে করত।এটাও বঙ্গবন্ধু বর্ণনায় তুলে ধরেছেন। এই কাজ করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধু লক্ষ্য করেন বাজারে সকল পণ্যের দাম নির্ধারিত, সহনীয় এবং স্থিতিশীল। কেউ এক সিকি পরিমাণও বেশি দাম রাখার সাহস পায় না বা রাখে না। আর একটা বিষয় হলো জাতীয়তাবোধ।তারা নিজের দেশের পণ্য ছাড়া অন্য দেশের পণ্য ব্যবহার করেনা এবং অনেকে ইংরেজি জানা সত্ত্বেও বঙ্গবন্ধু বা অন্যান্য ডেলিগেটদের সাথে নিজ দেশের ভাষায় কথা বলেছে। এজন্য অবশ্য দোভাষী প্রদান করেছে।

চীনের অর্থনৈতিক,সামাজিক এবং রাজনৈতিক এই পটপরিবর্তনের বর্ণনার পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের তৎকালীন অবস্থার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করেছেন। পাকিস্তানে দুর্নীতি,বিরোধী দলের উপর দমন-পীড়ন এবং সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার চিত্র তুলে ধরেন।যেখানে চীনে কোন বৈষম্য তিনি লক্ষ্য করেননি।মালিক শ্রমিকের সহাবস্থান, তাদের সততা,কর্মে নিষ্ঠা বঙ্গবন্ধুকে বিমোহিত করে।

বঙ্গবন্ধু চীন এবং পাকিস্তানের সরকারি বেতনের একটা তুলনামূলক পার্থক্য দেখিয়েছেন।

যেখানে বলা হয়েছে –

চীনের প্রধান নেতা মাও সে তুং এর মাসিক বেতন ছিল পাকিস্তানি টাকায় ৫০০ টাকা এবং সর্ব নিম্ন বেতন ছিল ৫০ টাকা।

অথচ পাকিস্তানের রাষ্টপতি বেতন পেতেন ১২ হাজার টাকা।অন্য সরকারি আমলারা ৪-৫ হাজার মাসিক বেতন থাকলেও তাদের লাগামহীন দুর্নীতির চিত্র তুলে ধরেন। সেই অর্থে চীনারা অনেক সুখে ছিল।কারণ লেখাপড়া, চিকিৎসা এবং চাকুরিজীবীদের সরকারি বাড়ি দেওয়া হতো ফ্রি।যেটা পাকিস্তানে কল্পনার বাইরে ছিল।

আরও পড়ুনঃ নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থের রুপাই চরিত্রের বাস্তব পরিচয় ও জীবনী

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভ্রমণ অভিজ্ঞতার পাশাপাশি বিভিন্ন বিষয় নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করেছেন।কিভাবে চীনের কৃষকরা তিন বছরে সাবলম্বী হলো,কিভাবে চীনা নাগরিকদের আফিমের নেশা কাটল,কিভাবে পতিতারা সমাজের মূল ধারায় ফিরে এলো, কিভাবেই বা সাধারণ মানুষের মধ্যে দেশাত্মবোধ জাগ্রত হলো, এসবই বঙ্গবন্ধু নিজের মতামত দিয়ে ব্যাখা করেছেন, কখনও চীনাদের যুক্তি শুনেছেন।

‘আমার দেখা নয়াচীন’ তাই এক অর্থে যেমন ভ্রমণকাহিনী অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে এটাকে বাস্তব রাজনৈতিক বিশ্লেষণও বলা চলে।বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যেমন রাজনৈতিক দূরদর্শী ছিলেন তেমনি তার বর্ণনা ভঙ্গির কারণে ৭০ বছর আগের ঘটনাকে রঙিন ছবির মতো পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন। সফরসঙ্গী আতাউর রহমান খান এবং তোফাজ্জল হোসেন(মানিক মিয়া)কে নিয়ে রসিকতা করতেও ছাড় দেননি।আর বঙ্গবন্ধুর সহজাত বৈশিষ্ট্য মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারাটা নয়াচীনেও অব্যাহত ছিল।সেখানকার শিশু,সেলুনের কর্মচারী এমনকি নব দম্পতির কাছেও তিনি স্মৃতির সোনালী পাতায় আবদ্ধ থাকবেন।

আজ বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে ৫০ বছর হতে চলল,পাকিস্তান আলাদা হয়েছে, তবে চীন সমহিমায় টিকে আছে। বঙ্গবন্ধু তার লেখায় উল্লেখ করেছেন, চীন যে গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে এই ধারা অব্যাহত থাকলে বড় দেশের খ্যাতি পাবে।সেটা আজ সত্যি হয়েছে। একজন তুখোড় রাজনীতিবিদ যা কিছু বলেন সেটার প্রতিফলন হওয়াটাই স্বাভাবিক।

সর্বোপরি,’আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থের মানের বিচারে উৎকৃষ্ট। ভ্রমণকাহিনীর পাশাপাশি এই গ্রন্থকে ঐতিহাসিক এবং কোন কোন ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ বললেও অত্যুক্তি হবে না। কেননা এই গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু পুরটো সময় চীনের প্রশংসা করেছেন, প্রশংসা করেছেন কমুনিস্টদের যদিও তিনি কমুনিস্ট সমর্থন করেননি।কমুনিস্টদের সবকিছু পছন্দ এবং প্রশংসায় ভাসালেও কমুনিস্টরা অন্য রাজনৈতিক দলের মতামতের সকল রাস্তা রুদ্ধ করে এককেন্দ্রিক যে শাসন কায়েম করছিল তা তিনি ভালো চোখে দেখেননি।

আরও পড়ুনঃ হাট্টিমাটিম টিম ছড়াটির লেখক কে? সম্পূর্ণ কবিতার আসল রচয়িতা কে?

বইয়ের নাম – আমার দেখা নয়াচীন।
লেখক – বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
প্রচ্ছদ মূল্য – ৪০০ টাকা।
মোট পৃষ্ঠা – ১৯৯।
রিভিউ লেখক – সাইফুল্লাহ আল মানসুর

১৯৫২ সালে চীনে অনুষ্ঠিত হওয়া পিস কনফারেন্স অফ দ্যা এশিয়ান এন্ড প্যাসেফিক রিজিওনস (Peace Conference of the Asian and Pacific Regions) বা শান্তি সম্মেলনে শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য হিসেবে চীন ভ্রমণ করেন। চীনে ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখল করে। কমিউনিস্ট বিপ্লব না বলে চীনা গৃহযুদ্ধ বলাটাই ভালো। কমিউনিস্টরা ক্ষমতায় আসলে চীনের নতুন জন্ম হয়। দেশটি নতুন নিয়মে সেজে উঠে। পুরোনো চীন থেকে হয়ে উঠে নতুন চীন। শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে তাই কমিউনিস্ট চীন হয়ে উঠলো নয়া চীন। ১৯৫২ সালে পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে শান্তি সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি চীনকে কীভাবে দেখেছেন? চীনের কোথায় কোথায় ভ্রমণ করেছেন। ভ্রমণের আরও অনেক কাহিনী নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখেছেন আমার দেখা নয়াচীন। বইটি বেশ বিস্তারিত। সে সময়ের বিশ্ব ব্যবস্থা সম্পর্কে ভালোই ধারণা পাওয়া যায়।

শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৯ সালের অক্টোবর মাসে গ্রেফতার হওয়ার পর ১৯৫২ সালের ২৭ শে ফেব্রুয়ারী মুক্তি পান। সেপ্টেম্বরে খবর আসে চীনের শান্তি সম্মেলনে যেতে হবে। তৎকালীন আওয়ামী লীগের সহ সভাপতি আতাউর রহমান, ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন বা মানিক ভাই, খোন্দকার মোহাম্মদ ইলিয়াস, ইউসুফ হাসান এবং শেখ মুজিবুর রহমান পূর্ব বাংলা থেকে যাবেন বলে ঠিক হলো। নতুন দেশ দেখবেন তিনি খুশি। কিন্তু যাবেন কী করে? ভিসা নেই, হাতে টাকা পয়সা নেই। অনেক কষ্টে ভিসা ও টাকা পয়সা যোগাড় হলো। এবার তিনি ছুটলেন ব্রিটিশ হাই কমিশনে। সেখান থেকেও ভিসা দরকার। কারণ পাকিস্তানে তখনও সংবিধান তৈরি হয় নি। তাই পাকিস্তান তখনো কাগজে কলমে ব্রিটিশ উপনিবেশ। পাকিস্তানিরা রাণীমার প্রজা। শেখ মুজিবুর রহমান এই ঘটনায় কষ্ট পেয়ে বিদ্রুপ করে লিখেন “হায়রে স্বাধীনতা!” সকাল ৯ টায় পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সকল সদস্যদের নিয়ে ব্রহ্মদেশ (বর্তমান মিয়ানমার) উদ্দেশ্যে রওনা হয়। দুপুর ২ টা নাগাদ পাকিস্তান প্রতিনিধিদল রেঙ্গুন পৌঁছালো। সেখানে আতাউর রহমান সাহেবের পরিচিত বিশিষ্ট বাঙালি ব্যবসায়ী আজমল খাঁ সাহেব তাদের ব্রহ্মদেশ ঘুরিয়ে দেখান। পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূতের সাথে তারা দেখা করেন। রাষ্ট্রদূত ঢাকার লোক। শেখ মুজিবুর রহমান তৎকালীন মিয়ানমারের অবস্থা উল্লেখ করেছেন এই গ্রন্থে।

তারপর তারা ব্যাংকক এবং হংকং পৌঁছান। শেখ মুজিবুর রহমান দু চোখ ভরা বিস্ময়ে হংকংকে দেখছিলেন। হংকং ইংরেজ কলোনি। পৃথিবীর অন্যতম সুন্দর শহর। হংকং এ বিভিন্ন দেশের মানুষ আছে। কয়েকজন পাকিস্তানি হিন্দুর সাথেও তাদের দেখা হয়। পাকিস্তানি হিন্দুরা ছিলেন সিন্ধু প্রদেশের অধিবাসী। তারা দেশের কথা জানতে চাইলো। শেখ মুজিবুর রহমানসহ বাকী সবাই তাদেরকে দেশের কথা জানালো। হংকং শহরের এক দোকানের কর্মচারী শেখ মুজিবুর রহমানকে বললেন কমিউনিস্ট চীনে যারাই যায় তারা সবাই সেখান থেকে এসে কমিউনিস্টদের প্রশংসা শুরু করে। দোকানের কর্মচারী ছিলো কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী। হংকং শহরকে দেখে শেখ মুজিবুর রহমান যতটা মুগ্ধ হয়েছেন অন্য কোন শহর দেখে বোধহয় এত মুগ্ধ হন নি। হংকং শহরের কর নেই। তাই জিনিসপত্র খুব সস্তা। তারা পাকিস্তানি টাকা পরিবর্তন করে হংকং ডলার করে নেন। শেখ মুজিবুর সেখান থেকে ২৪ টাকায় একটি জ্যাকেট কেনেন যা পাকিস্তানে কমপক্ষে ১০০ টাকা। হংকংয়ের এক তরুণী আতাউর রহমান সাহেবের কোটে গোলাপ ফুল লাগিয়ে দিতে গিয়েছিলো। আতাউর রহমান সাহেব চমকে উঠে রাগে গজ গজ করতে করতে সামনে চলে যান। শেখ মুজিবুর রহমান লিখেন – “আতাউর রহমান সাহেব ধার্মিক মানুষ। ‘আল্লাহ আল্লাহ’ করেন আর তাঁর একমাত্র সহধর্মিণীকে প্রাণের চেয়ে অধিক ভালোবাসেন।”

সেই মেয়েটি ছিলো পতিতা। হংকং এ গোলাপ ফুল দেওয়া মানে প্রেম নিবেদন। হংকং এ তখন এরকম হাজার হাজার মেয়ে ছিলো। তারপর তারা হংকং থেকে চীনের ক্যান্টন শহরে যান ট্রেনে করে। তারা ট্রেনে দু ধরনের চা ও ফলমুল খান। ইত্তেফাকের সম্পাদক তফাজ্জল হোসেন প্রচুর ফলমুল খাচ্ছিলেন। শেখ মুজিবুর রহমান জিজ্ঞেস করলেন মানিক ভাই পেটে কী হয়েছে? তফাজ্জল হোসেন বললেন দুর্ভিক্ষ হয়েছে। এরপর তারা ক্যান্টনে পৌঁছান। সেখান থেকে প্ল্যানে করে পিকিং (বর্তমান বেইজিং)। পিকিংয়ে অন্য দেশগুলোর প্রতিনিধিদের সাথে দেখা হলো। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের সদস্য ছিলেন ৬০ জন। পাকিস্তানের প্রতিনিধি দলের সদস্য ৩০ জন। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের প্রধান ড. সাইফুদ্দিন কিচলু। পাকিস্তানি প্রতিনিধি দলের প্রধান পীর মানকী শরীফ। ডেপুটি প্রধান জনাব আতাউর রহমান খান ও জনাব মাহমুদুল হক কাসুরী। শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধি দলের মনোজ বসুর বেশ ভাব হয়। শান্তি সম্মেলনে পাকিস্তানের পক্ষ হতে শেখ মুজিবুর রহমান এবং ভারতের পক্ষে মনোজ বসু বাংলায় বক্তৃতা করেন।২ রা অক্টোবর থেকে ১২ ই অক্টোবর পর্যন্ত শান্তি সম্মেলন হলো। টানা ১১ দিন। প্রথম দিন ম্যাডাম সান ইয়েৎ সেন চীনা ভাষায় বক্তৃতা করলেন। এরপর চীন শান্তি কমিটির সভাপতি কোঃ মোঃ জো বক্তৃতা করলেন। তারা চীনা ভাষায় বক্তৃতা করলেও কানফোনে সবাই ইংরেজিতে শুনছিলেন। ম্যাডাম সান ইয়েৎ সেন হলেন সান ইয়েৎ সেনের স্ত্রী। তিনি বললেন পিকিং শহরে ৩৭ টি দেশের ডেলিগেটদের জন্য ভালো জায়গা ছিলো না।

আআর পড়ুনঃ বাংলা গালি অভিধান PDF রিভিউ Bangla Gali Ovidhan PDF

মাও সে তুং জনগণের কাছে ৪ তলা ভবন নির্মাণের আহ্বান জানালেন। জনগণ ঝাঁপিয়ে পড়ে মাত্র ৭০ দিনে ৪ তলা ভবন নির্মাণ করলো। চীনে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে তাঁর বন্ধু মাহবুবের দেখা হয়। মাহবুব ছিলেন পাকিস্তান দূতাবাসের থার্ড সেক্রেটারি। শান্তি সম্মেলন চলার সময় ভারতীয় প্রতিনিধিদল প্রচুর উপহার এনেছিলো। এছাড়া শিল্পী, কবিসহ আরও অনেকে তাদের সঙ্গে ছিলো। পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল গিয়েছিলো প্রস্তুতি ছাড়া। শেখ মুজিবুর রহমান বুদ্ধি করে পীর মানকী শরীফসহ কয়েক খানা পাকিস্তানি পতাকা উপহার দেন। শেখ মুজিবর রহমান এটা নিয়ে আফসোস করেছেন। আমিও আফসোস করছি। অস্ট্রেলিয়ার একজন প্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানকে বলেন তোমাদের রাষ্ট্রদূতরা মনে করে পৃথিবীর মানুষ আহম্মক। তারা এখানে রাজার হালে থেকে বোঝাতে চায় তোমরা খুব ভালো আছো। কিন্তু পৃথিবীর মানুষ সত্য জানে। পাকিস্তানি প্রতিনিধি দল কাশ্মীর প্রস্তাব তুলতে চায়। ভারতীয় প্রতিনিধি দলের একজন তা করতে অস্বীকার করে। অবশেষে ড. সাইফুদ্দীনের চেষ্টায় ভারতীয় প্রতিনিধি দল রাজী হয় এবং উভয় দেশের প্রতিনিধি দলের সম্মতি কাশ্মীর প্রস্তাব পাশ হয়। শেখ মুজিবুর রহমান কাশ্মীরকে নিয়ে যা লিখেছেন তাতে বোঝা যায় তিনি কাশ্মীরকে কতটা ভালোবাসতেন। দক্ষিণ আমেরিকার একটি দেশের এক প্রতিনিধির সাথে শেখ মুজিবুর রহমানের আলাপ হয়। সেই প্রতিনিধি জিজ্ঞেস করলেন পাকিস্তান কী ভারতের একটি প্রদেশ? শেখ মুজিবুর রহমান তাঁকে বললেন পাকিস্তান একটি স্বাধীন দেশ।

শেখ মুজিবুর রহমান চীনের যেখানেই গিয়েছেলেন সেখান থেকেই প্রচুর উপহার পেয়েছিলেন। তিনি চীনাদের জাতীয়তা বোধ, উদ্যম এবং কর্ম স্পৃহা দেখে প্রচন্ড মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি পুরো পিকিং শহরে দাড়ি কামানোর জন্য ব্লেড খুঁজে পান নি। জানতে পারলেন চীনে ব্লেড কারখানা নেই। তাই দোকানগুলোতে ব্লেড নেই। চীনে ভিক্ষা করা নিষিদ্ধ। সবাইকে কাজ করে খেতে হয়। একদিন চীন সরকার দাওয়াত দিলো। সেখানে মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং চ্যু তে উপস্থিত থাকবেন। মাও সে তুং, চৌ এন লাই এবং চ্যুতে হাসিমুখে আসলেন। শেখ মুজিবুর রহমান দেখলেন চীনারা মাও সে তুংকে কতটা ভালোবাসে। তখন শেখ মুজিবুর রহমানের মনে পড়লো কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর কথা। যাকে ভারতের মুসলমানরা ঠিক এভাবেই ভালোবাসতো। ১ লা অক্টোবর চীনের লিবারেশন ডের অনুষ্ঠান তারা দেখেন। শেখ মুজিবুর রহমান সম্মেলেন শেষে ও চলাকালীন চীনের বিভিন্ন জায়াগায় ঘুরেছেন। গিয়েছেন তিয়ানজিং, সাংহাই, হ্যাংচু, নানকিং, ক্যান্টন শহরে। মাও সে তুং এর সাথে যেদিন দেখা হয় সেদিন সি কিয়াং প্রদেশের গভর্নর বোরহান শহীদের সাথে সাক্ষাৎ হয়। বোরহান শহীদ মুসলমান। তাঁর কাছ থেকে শেখ মুজিবুর রহমান চীনের মুসলিমদের অবস্থা জানার চেষ্টা করেন। এছাড়াও আরও কয়েকটি জায়গা থেকে শেখ মুজিবুর রহমান খোঁজ নেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলেন চীনের মুসলমানরা খুব ভালো আছে।

All China Islamic Cultural Association নামে মুসলমানদের একটি সংগঠনও আছে। শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বইয়ে লেখেন চীনের মানুষ ৬০ কোটি। ৮০ শতাংশই বৌদ্ধ। ৫ কোটি মুসলমান ও কিছু খ্রিস্টান আছে। যদিও বর্তমানে চীনের জনসংখ্যা ১৪৫ কোটির বেশি, বৌদ্ধ ১৮.৩ শতাংশ, মুসলমান ২ শতাংশ, স্থানীয় ধর্ম ২১.৯ শতাংশ এবং বাকী ৫১.৮ শতাংশ নাস্তিক।

চীনে মুসলমানের সংখ্যা ২ কোটি ৮০ লক্ষ। শেখ মুজিবুর রহমান চীনের সরকার ব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে বর্ণনা করেছেন তাঁর বইয়ের অর্ধেক অংশে। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন মাও সে তুং ৫০০ টাকা (তৎকালীন পাকিস্তানি টাকায়) বেতন পান এবং বাকী সকল সুযোগ সুবিধা ফ্রী পান। তিনি একটি প্রাসাদের ছোট দালানে থাকেন। শেখ মুজিবুর রহমান চীনের সরকারের অধিকাংশ নীতির প্রশংসা করেছেন। ১ টি নীতির সমালোচনা করেছেন। চীনের ধর্মীয় নীতির প্রশংসা করতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান আমাদের দেশের আলেমদের সঙ্গে তুলনা করেন। তুলনা করতে গিয়ে সিলেটের একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেন। সিলেটে তিনি পাকিস্তান রাষ্ট্রের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গিয়ে দেওবন্দী আলেমদের কী রুপ বিরোধীতার সম্মুখীন হয়েছেন এবং তা কীভাবে সামাল দিয়েছেন। এই ঘটনাটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চীনের ব্যাপারে চীনে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানি রাষ্ট্রদূত মেজর রেজার উক্তি উল্লেখ করে বলেছেন “যে দক্ষতার সাথে এরা শাসনকার্য চালাইতেছে তাতে অদূর ভবিষ্যতে দুনিয়ার যে কোন শ্রেষ্ঠ রাষ্ট্রের সাথে এদের তুলনা করা যাবে।” এই কথাটি সত্য প্রমাণিত হয়েছে।

চীন আজ দ্বিতীয় বৃহৎ অর্থনীতি এবং আমেরিকার সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে আজকের চীন অসিহষ্ণু। চীনে সকল ধর্মের অনুসারীরা সংখ্যায় অর্ধেকেরও বেশি কমে গেছে। চীনে আজ মুসলিমদের রক্ত ঝরে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যদি আজ বেঁচে থাকতেন এবং চীনকে দেখতেন তাহলে বিস্মিত হতেন ও কষ্ট পেতেন।

[আমার দেখা নয়াচীন বইতে সে সময়কার চীন ও পৃথিবী সম্পর্কে বেশ ভালো ধারণা পাওয়া যায়। শেখ মুজিবুর রহমান রোজেন বার্গ দম্পতির কথাও উল্লেখ করেছেন। যাদের পরমাণু অস্ত্রের রহস্য রাশিয়ানদের কাছে পাচার করার অপরাধে ইলেকট্রিক চেয়ারে বসিয়ে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হয়। এ বিষয় নিয়ে রোজেনবার্গ এফেয়ার শিরোনামে আমি বিস্তারিত লিখেছি।]

আরও পড়ুনঃ বনফুলের শ্রেষ্ঠ গল্প PDF Download | Bonofuler Srestho Golpo PDF

Tags:
x
error: Content is protected !!