যেকোন বইয়ের ফ্রি পিডিএফ পেতে অনুগ্রহ করে আমাদের PDF Download সেকশনটি ভিজিট করুন। প্রতিনিয়ত নতুন নতুন বইয়ে সাজানো হচ্ছে আমাদের এই অনলাইন পাঠশালা। সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ।
বই- ক্রীতদাসের হাসি
লেখক- শওকত ওসমান
রিভিউঃ শামিম হোসাইন
(স্পয়লার সর্তকীকরণ)
আমাদের ইতিহাস আছে, আমাদের গল্প আছে, আমাদের ভাষা আছে, আমাদের সংস্কৃতি আছে, আমাদের ধর্মও আছে। আমরা গর্বিত জাতি। ভাষার জন্য জীবন দিতে পারি। বাংলায় কথা বলতে জীবনকে তুচ্ছ করতে পারি। স্বাধীন সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় অস্ত্র হাতে শত্রুর আক্রমণের জবাব দিতেও পারি। ইতিহাসে আমরা বীরের জাতি। যদি এসব এখন শুধুই মিথ হয় আছে আমাদের জীবনে। আমরা প্রতিবাদ করতে ভুলে গেছি। নিজের অধিকার আদায়ের জন্য চোখে চোখ রেখে কথা বলতেও ভুলে গেছি। আমাদের জীবন আজ, ‘খাও দাও ফূর্তি করো, দুনিয়াটা মস্তবড়ো। তোমার স্বার্থ আগে নিশ্চিত করো।’ আজ বলবো, কালজয়ী উপন্যাসের কথা।
এই উপন্যাসটা কেন যে এত বেশি ভালো লাগে তা জানিনা। ‘ক্রীতদাসের হাসি’ এখন পর্যন্ত পাঁচবার পড়া হয়েছে। তারপরও নেশা থেকেই যায়।
মেহেরজানের রূপের অসাধারণ বর্ণনা। তাতারীর অকৃত্রিম প্রেম ও দৃঢ় মনোভাব। দুই কবির অভাবনীয় সুন্দর কবিতার উক্তি। শাসকের স্বৈরাচারী শাসন ও শোষণ। সব মিলিয়ে অসাধারণ উপস্থাপন।
কবি ইসহাকের উক্তি এখনো গেঁথে আছে,“হেকমী দাওয়াই তৈরি করতে যেমন অনেক উপাদান প্রয়োজন হয়, তেমনি হাসির জন্য বহু অনুপান দরকার।” কথাটা যে চিরন্তন সত্যি তা সবাই জানেন।
তাতারীর প্রাণখোলা হাসি শুনাতে না পারায় অপমানিত খলিফা সিদ্ধান্ত নিলেন কেন এই হাবশি গোলাম আর আগের মতো হাসতে পারছেন না, কোন উপাদানটির অভাব ঘটছে তা অনুসন্ধান করবেন। এ কারণে তাতারীর বাসগৃহের দাসদেরকেও জেরা করলেন তিনি, তাতারীর মনোরঞ্জনের জন্যেও পাঠালেন সারা বাগদাদের সবচে সেরা সুন্দরী বুসায়নাকে, যাকে পাওয়ার জন্য বাগদাদের লোকেরা দিরহাম ছুঁড়ে ফেলতে দ্বিধা করে না। কিন্তু সেই বুসায়নাও তাতারীর বুকে কাঁপন ধরাতে ব্যর্থ হওয়ার পর আত্মহত্যা করলে কবি আবু নওয়াসের কাছে বাজি ধরা খলিফা চরম অপমানিত হলেন। তাতারীর মনজুড়ে শুধু ছিল অপরূপ সুন্দরী বাদী মেহেরজান।
এরপরই তাতারীর জীবনে নেমে আসে অসহনীয় নির্যাতন। তাতারীকে বুসায়নাকে হত্যা করার মিথ্যা অপবাদ দিয়ে তার উপর প্রতিনিয়ত অত্যাচার চালানো শুরু হলো। কোড়ার আঘাতে তাতারীর কালো চামড়া ফালিফালি করেও তাতারীর সেই প্রাণখোলা হাসি শুনতে পেলেন না খলিফা। এক এক করে চার বছর কেটে গেল, বাজি ধরে অপমানিত খলিফা শেষ সুযোগ দিতে চাইলেন হাবশি গোলামকে। জল্লাদ মশরুর নিজেই কোড়াদাড়কে সরিয়ে দিয়ে তাতারীকে বেধড়ক পিটিয়েও তার মুখ থেকে হাসি বের করতে পারলোনা। খলিফা শেষ চেষ্টা করলেন তাতারীর একসময়ের প্রণয়ী মেহেরজানকে তার কাছে নিয়ে এসে। হারেমের আনন্দঘন পরিবেশে সময় কাটানো মেহেরজান কোড়ার (চাবুক) আঘাতে ত্বক উঠে যাওয়া, রক্তাক্ত, চোখ ফুলে যাওয়া তাতারীকে চিনতে পারে;নি। সে ভুলেই গিয়েছিল তার একসময়ের প্রেয়সীকে, ভুলে গিয়েছিলেন যার সাথে সমগ্র রাত যৌন ইচ্ছে মিটিয়ে হাসির ফোয়ারা ফুটানো ও প্রেমের সেই অসাধারণ মুহূর্তগুলো।
আরও পড়ুনঃ হ্যামলেট শামসুর রাহমান | শেক্সপিয়ারের নাটকের বাংলা অনুবাদ PDF
কিন্তু যখন বলে দেয়ার পর তাকে চিনতে পারলো, অনুশোচনা করেও কোনো লাভ হলো না। মেহেরজানের প্রেম ছিল যৌবিক যৌনতা সম্পর্কিত। আর তাতারির প্রেম ছিল আত্নার প্রেম। দেহ-নির্ভরতার প্রেম হারিয়ে যায়। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে দৃশ্যমান। কিন্তু আত্মার প্রেম হারিয়ে যায় না। হৃদয় গহ্বরের সমগ্র জায়গা জুড়ে থেকে যায়। প্রেম তো সবাই বোঝে, কিন্তু ভালোবাসা কজনে বোঝে? তাতারী এমনই একজন ছিলেন। মৃত্যু দিয়েই প্রেয়সীর মনের মধ্যে বার্তা দিতে পেরেছিল যে আমি তোমাকেই ভালোবাসি। এক নারীতে আসক্ত পুরুষ তাতারীর এই অকৃত্রিম ভালোবাসা সত্যিই দারুণ করে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক।
“গোলামের মহব্বৎ আর এক আলাদা চিজ। তা আমির-ওমরার মহব্বৎ নয়। তারা দৌলতের কদর বোঝে। গোলামের প্রেম ধ্রুবতারার মতো স্থীর- আকাশের একটি প্রান্তে একাকী মৌন-অবিচল।”
মেহেরজান আমির-ওমরাদের ঐশ্বর্যে অভীভূত হয়ে তাতারীকে ভুলে গেলেও, তাতারী তাকে ভুলে যায় নি। ঐশ্বর্য-সেবাকে ঠেলে দিয়ে নিজের হাসিকে দিরহামের কাছে বিকিয়ে দেয় নি। আর তখনই সে খলিফা হারুন-অর-রশিদকে চিৎকার করে জানিয়ে দিলো, ক্রীতদাস- বান্দাদেরকে দিরহামের বিনিময়ে কেনা যেতে পারে, কিন্তু ক্রীতদাসের হাসিকে নয়। কারণ হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি। এমনই এক অভাবনীয় অসাধারণ গল্প উপস্থাপন করেছেন শওকত ওসমান। গল্পটা তথাকথিত স্বৈরাচার আইয়ুব খানকে উদ্দেশ্য করে লেখা। আরব্য রজনী গল্প বলা হলেও এটা স্বৈরাচারী আইয়ুবের অপশাসন নিয়ে লেখা। যা গল্প হলেও সত্যি।
১৯৬২ সাল। সমগ্র পাকিস্তান জুড়ে সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে, বাঙালিদের ঘাড়ে চেপে রয়েছে নিকৃষ্ট স্বৈরাচার আইয়ুব খান। পূর্ব বাংলা স্বৈরশাসনের অত্যাচার-নিষ্পেষণে নরকতুল্য হয়ে উঠেছে, যেন উপন্যাসের বাগদাদেরই প্রতিচ্ছবি। বাক-স্বাধীনতা হরণ করা হয়েছে, প্রতিবাদ করতে গেলেই মুখে চেপে বসছে শাসকের জাঁতাকল, প্রতিনিয়ত কমে আসছে গণমাধ্যমের সংখ্যা। যেমন বর্তমান সরকারের অপশাসন আমাদের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে ভোটবিহীন একদলীয় শাসন কায়েম করে তাবেদার রাষ্ট্রের ইজারা নিয়ে দেশ পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিনা ভোটের অবৈধ প্রধানমন্ত্রী হয়ে শাসনের নামে শোষণ করে যাচ্ছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে আইয়ুব খানের প্রেতাত্মা বললে ভুল হবে। বাকস্বাধীনতা নেই, গণমাধ্যমের গলা চেপে ধরে আছে। ভিন্নমত দমনে বর্তমান স্বৈরাচার আইয়ুব খানকেও হার মানিয়েছে।
আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনকেই ব্যঙ্গ করে শওকত ওসমান এ উপন্যাসটি লিখেছিলেন। যেখানে রূপক অর্থে পূর্ববাংলা হয়ে উঠেছে বাগদাদ, খলিফা হারুন-অর-রশিদ হলেন স্বয়ং আইয়ুব খান আর তাতারী হলো স্বাধীনতাকামী বাঙালিদের প্রতিনিধি। আইয়ুব খানের ‘ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ বইটি যেন তাতারীকে গোলামি থেকে মুক্ত করাকেই নির্দেশ করছে। কিন্তু বাঙালি কখনোই মুক্ত ছিলনা, বাগদাদে আবদ্ধ তাতারীর মতোই ছিল শৃঙ্খলিত। বাকস্বাধীনতাহীন বাঙালিকে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করা হলেও জনগণের অধিকার আর প্রকৃত স্বাধীনতার অভাবে পূর্ববাংলার লোকজন তাতারীর মতো প্রাণখোলা হাসি আর হাসতে পারে না। উপন্যাসে ক্রীতদাসের হাসিকে ব্যক্তিসত্ত্বার স্বাধীনতার রূপক অর্থ হিসেবেই ব্যবহার করা হয়েছে।
আরও পড়ুনঃ পদ্মাবতী কাব্য PDF রিভিউ | সৈয়দ আলী আহসান | Alaol Padmavati
ক্ষমতা আর শক্তি দেখিয়ে মানুষের মুক্ত স্বাধীন মন অধিকার করা যায় না। ‘হাসি মানুষের আত্মারই প্রতিধ্বনি’ বাক্যটির মাধ্যমে লেখক যেন স্বাধীনতার পূর্বাভাস দিচ্ছেন। আর পূর্ববাংলার সাধারণ মানুষের চেপে রাখা প্রতিবাদকে ফুটিয়ে তুলেছেন হাবশি গোলাম তাতারীর আর্তনাদের মাধ্যমে। যেমন চলছে একটানা ১৫ বছর আমাদের দেশে স্বৈরাচারের অপশাসন। প্রতিবাদ করার মতো কেউ নেই। শওকত ওসমানের মতো কেউ একজন আর স্বৈরাচারের বিপক্ষে ও নিপিড়ীত জনগণের পক্ষে দাঁড়ায় না। সবাই যার যার স্বার্থ খোঁজাতে ব্যস্ত। অবৈধ স্বৈরাচারের শাসনের কেন্দ্রবিন্দু ব্রাহ্মণ্যবাদ শাসনের নাঁটাই ভারতে। বর্তমান দেশের মানুষের মধ্যে তাতারি গোলামের মতোও একজন নেই। সব দরবারি চাকরবাকর হয়ে গেছে।
রূপক অর্থকে ঢাকতে শওকত ওসমান ধার নিলেন আরব্য রজনীর ছদ্মবেশকে। আলেফ লায়লা ওয়া লায়লা (সহস্র ও এক রাত্রি)-কে পরিণত করলেন আলেফ লায়লা ওয়া লায়লানে (সহস্র ও দুই রাত্রি)-তে, যার শেষ গল্প এই ‘জাহাকুল আবদ’ অর্থাৎ ‘ক্রীতদাসের হাসি’। এই গোলামের হাসির মাধ্যমেই ফুটিয়ে তোলা হলো সামরিক দুঃশাসন এবং বাঙালির স্বাধীনতা স্বপ্ন। এই রূপক অর্থ ধরতে পারে নি মূর্খ পাকি শাসকগোষ্ঠী। ভাষার মাসে এসে ‘ক্রীতদাসের হাসি’ নিয়ে যখন লিখতে বসেছি। সেই মুহূর্তে দেশে বিরাজমান আইয়ুব খানের প্রতিরূপ আরেক স্বৈরাচারের শোষণ। তাই আমি মনে করি ‘ক্রীতদাসের হাসি’ আজো সমকালীন। আজো তাতারীরা বলছে, ‘শাসন নামক শোষণের অবসান ঘটুক। অবশ্যই আমি মনে ‘ক্রীতদাসের হাসি’ আজো প্রাসঙ্গিক। কারণ স্বৈরশাসক এখনো দৃশ্যমান।
রিভিউ হলো কি-না জানিনা। কিন্তু চেষ্টা করলাম বাস্তবতার নিরিখে তুলে ধরার। উপন্যাস হলো জীবনের অংশ, যা সমকালীন। যা নিয়ে লেখা হয়েছে তা উপস্থাপন করাই পাঠকমহলের নৈতিক দায়িত্ব। এত কিছু ভেবে তো আর আমাদের আওয়াজ থামিয়ে রাখবোনা। অপশাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ অতীতে ছিল, এখনো অব্যহত থাকবে ইনশাআল্লাহ।
আরও পড়ুনঃ ইডিপাস নাটকের বিষয়বস্তু | Oedipus Rex Bangla Summary PDF