Skip to content
Home » আবু ইসহাকের গল্প : ডুবুরির কৌতুকপূর্ণ চোখ | ২ | আহমাদ মোস্তফা কামাল

আবু ইসহাকের গল্প : ডুবুরির কৌতুকপূর্ণ চোখ | ২ | আহমাদ মোস্তফা কামাল

আবু ইসহাকের গল্প-ডুবুরির কৌতুকপূর্ণ চোখ (2)

আবু ইসহাকের দুটো উপন্যাসেরই— সূর্য-দীঘল বাড়ী ও পদ্মার পলিদ্বীপ— বিষয়বস্তু গ্রামের মানুষ, গ্রামীণ সমাজ ও জীবন। গল্পে তিনি কাজ করেছেন বিবিধ বিষয় নিয়ে। তাঁর দুটো গল্পগ্রন্থভুক্ত ২১টি গল্পের মধ্যে জোঁক এবং আবর্ত— মাত্র এই দুটো গল্পে তীব্রভাবে গ্রামীণ জীবন এসেছে। দাদির নদীদর্শন, শয়তানের ঝাড়ু, বোম্বাই হাজি ইত্যাদি গল্পে গ্রামীণ সমাজের দেখা মিললেও এগুলোর মূল উদ্দেশ্য গ্রামীণ সমাজ ও জীবনের বর্ণনা নয়— ধর্মীয় কুসংস্কারের জালে বন্দি মানুষের গল্প বলা হয়েছে এগুলোতে।

অন্যদিকে উত্তরণ, কানাভুলা, বিস্ফোরণ ইত্যাদি গল্প নিম্নশ্রেণীর মানুষ নিয়ে লেখা হলেও তাদের দৈনন্দিন জীবনের বহুবিধ সংকটের বর্ণনা নেই এসব গল্পে, রয়েছে সাধারণ মানুষদের মধ্যে অসাধারণ মানবিক বোধের উন্মোচনের গল্প। যেমন কানাভুলা গল্পে ধর্মীয় কুসংস্কারের (পীরপ্রথা, ঝাড়ফুঁক, তাবিজ-কবজ ইত্যাদি) বিরুদ্ধে সুকৌশল প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে এক রিকশাচালকের মাধ্যমে। কিংবা উত্তরণ গল্পে এক প্রতারক দুধ-বিক্রেতার মধ্যে পিতৃস্নেহের উন্মোচন চমৎকার একটি গল্পের মাধ্যমে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছে। আবার বনমানুষ, প্রতিবিম্ব, বর্ণচোর প্রভৃতি গল্পের বিষয়বস্তু নাগরিক জীবন।

নাগরিক জীবন নিয়ে তাঁর গল্পগুলো গতানুগতিক নয়— শহুরে মানুষ ও জীবনের মধ্যে লুক্কায়িত ভণ্ডামি ও শঠতার উন্মোচন রয়েছে কোনো কোনো গল্পে, কোনো গল্পে রয়েছে নাগরিক যন্ত্রণার চমৎকার বিবরণ। উদাহরণ হিসেবে বনমানুষ-এর কথা বলা যেতে পারে। গল্পটি ১৯৪৭ সালে লেখা, কলকাতা শহরের পটভূমিতে। এক যুবক বনবিভাগের চাকরি ছেড়ে নতুন চাকরি নিয়ে এসেছে শহরে, দ্বিগুণ মাইনে ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নিয়ে। গল্পটিতে ওই যুবকের ভাষ্যে রচিত হয়েছে কলকাতা শহরে তার একটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতার কথা।

আরও পড়ুনঃ সিদ্ধান্তহীনতা দূর করার উপায় কি? আমরা কেন সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগি?

অত্যন্ত কৌতুকপূর্ণ দৃষ্টিতে লেখক দেখেছেন নাগরিক কার্টেসি, ম্যানার, ফর্মালিটিজ ইত্যাদিকে। যেমন সকালে উঠে শেভ করতে হবে, স্যুট-কোট পরে এবং সেগুলোর ভাঁজ অক্ষত রেখে অফিসে যাবার চিন্তা করতে হবে। কিন্তু তার সুযোগ কোথায়? যেতে হবে পাবলিক বাসের গাদাগাদি ভিড়ে কোনোমতে নিজেকে সেঁধিয়ে দিয়ে, সহযাত্রীদের কাছ থেকে গালাগালি শুনতে শুনতে। তা-ও যদি নিরাপদে বিনাচিন্তায় পৌছানো যেত! প্রতিমুহূর্তে কোনো একটি দুর্ঘটনার ভয়, কাউকে বিশ্বাস করা যাচ্ছে না, যেন সবাই নিজের শার্টের নিচে লুকিয়ে রেখেছে একেকটি ভয়ংকর ছুরি (ওই সময়টি ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাবিক্ষুব্ধ, তারই এক চমৎকার বিবরণ পাওয়া যায় গল্পটিতে)।

শেষপর্যন্ত অফিসে গিয়ে পৌঁছতে পারলেও, শান্তি মেলে না। দেরিতে পৌঁছানোর জন্য বিব্রত সে, আসার সময় প্রিয়তম দামি কলমটিও হারিয়ে এসেছে। ওদিকে নতুন মানুষ পেয়ে অধস্তনরাও তাকে দিয়ে কাজ করিয়ে নিতে চায় এমন ভঙ্গিতে যেন তারাই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা! অর্থাৎ কোথাও কোনো ইতিবাচকতা নেই এই শহরে— কেবলই আতঙ্ক. যন্ত্রণা, শত্রুতা! কৌতুকপূর্ণ বর্ণনার কারণে গল্পটি বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠলেও আমাদের মনে জেগে থাকে শহরের এই নিষ্ঠুরতার কথা। আমাদের তিনি জানিয়ে দেন এই জীবনের অন্তর্নিহিত অন্তঃসারশূন্যতার কথা, নির্মমতার কথা। বহিরঙ্গের চাকচিক্য নয়— ডুবুরির মতো তিনি গভীর থেকে তুলে আনেন শহুরে জীবনের গ্লানি।

গ্লানিময় এই জীবনের চিত্র আছে প্রতিবিম্ব গল্পেও। অফিসের বড়সাহেব ঢিলেঢালা পোশাক পছন্দ করেন না বলে তার মন রক্ষার্থে এই গল্পের নামহীন নায়ক(!) তেতাল্লিশ টাকা দিয়ে একটা কোট কিনে ফেলে, যদিও তার মাসিক বেতন আশি টাকা! সংসারে যদিও হা-করা দারিদ্র্য, মশারি নেই, বালিশের ওয়াড় নেই, চুলো জ্বালানোর লাকড়ি পর্যন্ত নেই; তবু তাকে ‘এ সিম্বল অব স্লাগিশনেস’ ‘ঢিলে বলদ’ ‘ল্যাবেন্ডিশ’ এইসব অভিধা থেকে নিজেকে রক্ষা করার জন্য কোটটি কেনা ছাড়া উপায় থাকে না— কারণ ‘ওসব ঘরের জিনিস। না থাকলেও কেউ দেখতে আসবে না।’ কিন্তু যথার্থ পোশাক না হলে চাকরি বাঁচানোই দায়। গল্পের প্রায় পুরোটাই জুড়ে আছে এই যুবকের অনটনময় সংসারজীবন আর উল্টোপিঠে অফিসিয়াল কার্টেসি রক্ষার দায়— এ দুয়ের কৌতুকপূর্ণ বিবরণ। কিন্তু এর পেছনে রয়ে গেছে এক চোখ-ভেজানো মানবিক গল্পের উদ্ভাসন।

আরও পড়ুনঃ মাইকেল মধুসূদন দত্ত জীবনচরিত | বাংলা সাহিত্যে অবদান | জীবনী

অফিস থেকে ফেরার পথে একটি বাড়ির সামনে দিয়ে আসার সময় একটা ছোট্ট ছেলে এসে তাকে আব্বু বলে জড়িয়ে ধরে, সে ফিরে তাকাতেই বাচ্চাটি বুঝতে পারে যে, সে ভুল করে ফেলেছে। কিন্তু যুবকের চোখে বাড়ির ঠিকানাটা আটকে যায়— ১১ নং হিম্মত সরদার লেন— মনে হয় এই ঠিকানা তার চেনা। বাসায় ফিরতে ফিরতে তার মনে পড়ে— কোটের পকেটে সে একটা চিঠি পেয়েছিল, সেখানেই এই ঠিকানাটি লেখা ছিল। চিঠিটা ছিল এই কোর্টের পুরনো মালিকের লেখা— তার বন্ধুকে উদ্দেশ করে, যদিও সেটা শেষপর্যন্ত পোস্ট করা হয়নি। সে বাসায় ফিরে চিঠিটা পড়তে পড়তে দেখা পায় এক অশ্রুসিক্ত গল্পের। কোটের পুরনো মালিকও তার অফিসের বড়কর্তাদের মন জুগিয়ে চলতে গিয়ে একের-পর-এক পোশাক পাল্টাতে বাধ্য হচ্ছিল এবং শেষ পর্যন্ত এটাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল, সন্দেহের দৃষ্টি পড়েছিল তার ওপরে; এত কম মাইনের একজন কেরানি কীভাবে এত বাহারি পোশাক পরে— এই সন্দেহের বলি হয়ে সে চাকরিটা হারিয়েছিল। তারও ছিল ঘরভর্তি দারিদ্র্যের হাহাকার, কিন্তু চাকরি বাঁচানোর তাগিদে তাকে পোশাকের দিকে নজর দিতে দিতে নিজেই পড়েছিল এক দুরারোগ্য ব্যাধিতে, এবং অবশেষে অকালেই মৃত্যুর কাছে হার মানতে বাধ্য হয়েছিল।

এই গল্পে নাগরিক জীবনে, বিশেষ করে অফিসপাড়ার অহেতুক কার্টেসি, পোশাক-আড়ম্বর এবং ঊর্ধ্বতনদের অমানবিক আচরণকে চাবুকাঘাত করা হয়েছে। কিন্তু সেইসঙ্গে গল্পের নামহীন নায়কের অসহায়ত্বও চমৎকার কুশলতায় উঠে এসেছে— ওই যুবক আসলে ওই কোটের পুরনো মালিকের মধ্যে নিজের জীবনের ছায়া দেখতে পায়, অনুভব করে সে-ও ওই একই জীবনের শিকার, হয়তো পরিণতিও হবে একইরকম।

এদিক থেকে দেখতে গেলে ঘুপচি গলির সুখ গল্পের হানিফের আচরণটিকে এসবের বিরুদ্ধে একটি নীরব প্রতিবাদ হিসেবে দেখা চলে। গল্পের শুরুতেই লেখক আমাদেরকে জানাচ্ছেন : “পরীক্ষার খাতায় পঁয়ত্রিশ নম্বর আর পঁয়ত্রিশ টাকার চাকরি—– এই ছিল হানিফের চরম আকাঙ্ক্ষা”। তার দুটো আকাঙ্ক্ষাই পূরণ হয় এবং ‘ক’-না-জানা করিমনকে নিয়ে সে ‘নাজিরাবাজারের এক ঘুপচি গলির শেষে, শাহি নর্দমার পাশে, খানদানি দেয়ালের বেষ্টনীর মধ্যে একটা কোচোয়ানি কুঁড়েঘরে’ জীবন শুরু করে। ৫৩ টাকার চাকরিতে আর কুঁড়েঘরের জীবনে সে সুখী, কারণ— “মানুষের আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই বলে নাকি মানুষ সুখী নয়। তাকে পৃথিবীর অর্ধেক দিয়ে দিলেও নাকি সে খোঁজ করবে— বাকি অর্ধেক কোথায়? জীবনে সুখী হওয়ার জন্যে তাই অনেক সাধ্যসাধনা করে হানিফ আকাঙ্ক্ষা দমনের অনেক কৌশল আয়ত্ত করেছে”।

আরও পড়ুনঃ নকশী কাঁথার মাঠ কাব্যগ্রন্থের রুপাই চরিত্রের বাস্তব পরিচয় ও জীবনী

আবু ইসহাকের কৌতুকপূর্ণ বিবরণ তুলে ধরার জন্য এই গল্প থেকে আরও একটু দীর্ঘ উদ্ধৃতি দিচ্ছি :

পোলাও-কোর্মা আমাদের পকেট খালি ও পেট খালাস করে দেয়। তাই ভেবে আমার স্ত্রী তা রাঁধতে শিখেনি। তবে গুঁড়ামাছ, শাক, ডাল আর ভাত রান্নায় সে দক্ষহস্ত। মিলের মোটা শাড়ি তালি দিয়ে দিয়ে পরতে সে অভ্যস্ত। স্বামীর খেদমতে সর্বক্ষণ ব্যস্ত, কারণ তার পায়ের তলায় নাকি বেহেশত। মাসের শেষের দিকে নুন-ভাত খেয়ে তৃপ্ত। মিতব্যয়িতার বুদ্ধিতে দীপ্ত। ম্যালেরিয়া জ্বরে না হয় জব্দ। স্বামীর কটু-কথায় না করে শব্দ ।

কিংবা-

স্ত্রী খুশি। কারণ এহেন বাসায় তার পর্দার কোনোরূপ বরখেলাপ হবে না। আর বাচ্চাকাচ্চাদের গায়ে বাও-বাতাস লেগে অসুখ করবে না। … হানিফ মহাখুশি। কারণ বেনারসি, জামদানি, ক্রেপ, জর্জেটের ঝলমলানি আর সোনা-গয়নার চকমকানি তার স্ত্রীর চোখে জ্বালা ধরাবে না। এসেন্স আর সুবাসিত তেলের সুগন্ধ নর্দমার দুর্গন্ধ ছাপিয়ে তার নাসারন্ধ্রে প্রবেশ করবে না। রুজ লিপস্টিক দূরের কথা, হেজলিন পমেডের অস্তিত্ব আবিষ্কৃত হবে না কোনোদিন। বিজলিবাতির আলো চোখ ধাঁধাবে না। সিনেমার বিজ্ঞাপন অনধিকার প্রবেশ করবে না। আর রেডিওর গান শরিয়ত বরবাদ করবে না।…

অথবা-

ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্যে হানিফ একটুও ভাবে না। বড় ছেলেমেয়ে দুটো ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে পড়ছে। সরকারি খরচে নাম আর নামতা গোনা পর্যন্ত শিখলেই হল, তার বেশি নয়। বেশি পড়লেই ছেলেগুলোর চোখ খুলবে, ভ্রু কুঁচকাবে, বড় চাকরির দুরাকাঙ্ক্ষা করবে। কোনোমতে একটা বড় চাকরি যদি জুটে যায় কারো, তবে তার আকাঙ্ক্ষার পাখি খুশিমতো উড়তে না পারলে খালি হায় আফসোস করবে— অমুকে তমুক জিনিসটা কিনেছে, তার জিনিসটা বড্ড কদাকার। অমুক জিনিসটা না হলে ইজ্জত বাঁচে না।…তাই হানিফের মত হচ্ছে– অধিক বিদ্যা ভয়ঙ্করী, অল্পবিদ্যা শুভঙ্করী।

চাকচিক্যপূর্ণ ভোগবিলাসের জীবনের প্রতি এ যেন এক তীব্র বিদ্রূপ। হানিফ তার চারপাশে যে দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তুলেছে তা হয়তো ওই জীবনের প্রতি তার অনাগ্রহ নয়, বরং নিজের অক্ষমতার প্রতি সচেতন বলেই এ ছাড়া তার আর করার কিছুই থাকে না । এবং পাঠকের মনে হয়— ওই জীবনের লোভে গ্লানিকর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়ার চেয়ে বরং এরকম দুর্ভেদ্য দেয়াল গড়ে তোলা অনেক ভালো।

আরও পড়ুনঃ হাট্টিমাটিম টিম ছড়াটির লেখক কে? সম্পূর্ণ কবিতার আসল রচয়িতা কে?

আহমাদ মোস্তফা কামাল 
ডিসেম্বর ২০০৫
Tags:
x
error: Content is protected !!